সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

ইরান যুদ্ধ শেষ হবে, থেকে যাবে মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈরিতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মে ৯, ২০২৬, ০৩:৪৭ পিএম

ইরান যুদ্ধ শেষ হবে, থেকে যাবে মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈরিতা

ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলা ১০ সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে দুই পক্ষ একটি সম্ভাব্য চুক্তির দিকে এগোলেও, এর দীর্ঘস্থায়ী পরিণাম হিসেবে প্রধান মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটছে। রয়টার্সের এক বিশেষ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য ইউরোপ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে গভীর আস্থার সংকট ও নতুন শঙ্কা তৈরি করছে।

মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের অনড় অবস্থান জার্মানি থেকে ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এবং ইউরোপের অন্যান্য স্থান থেকে সেনাসংখ্যা কমানোর হুমকি মিত্রদের বিচলিত করেছে। বিশেষ করে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ যখন মন্তব্য করেন যে ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্রকে অপমান করছে, তখন ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে পেন্টাগনকে জার্মানিতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের কর্মসূচি বাতিল করতে নির্দেশ দেন। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গড়ে ওঠা নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে ট্রাম্প যেভাবে ওলটপালট করে দিচ্ছেন, তাতে ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন চরম ঝুঁকির মুখে।”

জ্বালানি সংকট ও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের ওপর হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এতে এক অভূতপূর্ব বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়, যার ফলে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলো। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে মিত্ররা ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট সমর্থন করছে না। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি জানিয়েছেন, ট্রাম্প ন্যাটো এবং অন্যান্য মিত্রদের প্রতি তার হতাশা স্পষ্ট করেছেন এবং যারা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি, তাদের শাস্তি দেওয়ার বিষয়টিও পেন্টাগন বিবেচনা করছে। এর মধ্যে স্পেনের সদস্যপদ স্থগিত করা এবং ব্রিটেনের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের দাবির প্রতি মার্কিন স্বীকৃতি পর্যালোচনার মতো বিষয়গুলো রয়েছে।

ইউরোপের নতুন রণকৌশল ট্রাম্পের এমন অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় সরকারগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং যৌথভাবে অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। বিশ্লেষক জেফ রাথকে মনে করেন, ইউরোপীয় নেতারা এখন ট্রাম্পের আলোচনার কৌশলের বিষয়ে সচেতন এবং তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী হয়ে রুখে দাঁড়াচ্ছেন। তবে রাশিয়ার সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রতিরোধের জন্য পরাশক্তি মিত্রের ওপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা কাটাতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার উদ্বেগ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ তেল বন্দরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাকে ট্রাম্প ‘সামান্য’ বলে উড়িয়ে দেওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো শঙ্কিত। তারা আশঙ্কা করছে, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি করতে পারেন যা তাদের বিপজ্জনক প্রতিবেশীর মুখোমুখি করে দেবে। 

অন্যদিকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া বিচলিত এই ভেবে যে, চীনের সঙ্গে কোনো সংঘাতে (যেমন তাইওয়ান আক্রমণ) যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আর নির্ভরযোগ্য সহায়তাকারী হিসেবে থাকবে না।সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র যখন তার মিত্রদের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে, তখন চীন ও রাশিয়া এই কৌশলগত সুযোগটি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়া লাভবান হয়েছে। অন্যদিকে চীন নিজেকে ট্রাম্পের চেয়ে আরও বেশি নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করছে। 

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ইরান যুদ্ধ ও মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের স্থানান্তর চীন ও রাশিয়াকে তাদের প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে আরও জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ হয়তো শেষ হচ্ছে, কিন্তু বিশ্ব মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা ও মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের ভাঙন দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগামী মাসে একটি বিশেষ প্রতিরক্ষা সম্মেলনে বসতে যাচ্ছে।