অক্টোবর ২৪, ২০২৫, ১০:৫৪ এএম
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথরেখা তৈরির চেষ্টা চলছে, তখন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেকার বোঝাপড়া এবং মতপার্থক্যগুলোও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কিছু গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।
তিনি মন্তব্য করেছেন, জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই জুলাই সনদ এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জটিলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। বিশেষ করে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ব্যবস্থা এবং গণভোট আয়োজনের মতো বিষয়গুলোতে জামায়াতের অবস্থানকে তিনি নির্বাচন পেছানোর কৌশল এবং এক ধরনের ‘ব্ল্যাকমেইলিং’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মিডিয়ায় প্রচারিত তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তার আলোচনায় বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ সংলাপে প্রাথমিকভাবে সংসদের নিম্ন কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালুর বিষয়টি কোনো এজেন্ডাতেই ছিল না। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী যখন বুঝতে পারল যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন ঠেকানো বা পেছানো সম্ভব হচ্ছে না, ঠিক তখনই তারা নিম্ন কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালুর দাবিটি সামনে নিয়ে আসে।
রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, জামায়াত এমনকি এমন হুমকিও দিয়েছে যে, যদি নিম্ন কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু না করা হয়, তবে তারা নির্বাচনেই অংশগ্রহণ করবে না। জামায়াতের এই অবস্থানকে সরাসরি ‘ব্ল্যাকমেইলিং’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বিএনপির এই নেত্রী বলেন, “জামায়াতের এই যে ব্ল্যাকমেইলিং, কিছু হলেই আমরা ভোটে যাব না, নির্বাচন বর্জন করব— এগুলো হচ্ছে অন্য রাজনৈতিক দল ও সরকারকে এক ধরনের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মধ্য দিয়ে নিজের ফায়দা হাসিলের চেষ্টা।
শুরু থেকেই জামায়াত জটিলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।” তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, বিএনপি জামায়াতের এই কৌশলকে ইতিবাচকভাবে দেখছে না এবং এটিকে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের পথে একটি বাধা হিসেবে মনে করছে।জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান ধাপ হিসেবে গণভোট আয়োজনের বিষয়টি নিয়েও জামায়াতের অবস্থানের সমালোচনা করেন রুমিন ফারহানা। তিনি গণভোটের জটিলতার দিকটি তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে এর আগে যে তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটিতেই জনগণকে শুধু ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর মাধ্যমে তাদের রায় জানাতে হয়েছে।
কিন্তু এবারের জুলাই সনদে মোট ৮৪টি ধারা রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলো ধারা নিয়েই বিভিন্ন দলের মধ্যে মতপার্থক্য বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই ৮৪টি ধারার মধ্যে হয়তো ৫ থেকে ১০টি ধারায় বিএনপির নিজেরই নোট অব ডিসেন্ট আছে, আবার অন্য ৫ থেকে ১০টি ধারায় জামায়াতে ইসলামীর নোট অব ডিসেন্ট থাকতে পারে। একইভাবে, অন্যান্য দলেরও বিভিন্ন ধারায় ভিন্নমত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, সরকার কি দেশের প্রায় ১১ কোটি ভোটারকে এই ৮৪টি ধারা এবং সেগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকা বিভিন্ন দলের নোট অব ডিসেন্ট সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণে তথ্য সরবরাহ করতে পেরেছে?
দেশের সকল ভোটারের কি সেই সক্ষমতা আছে যে, তারা এই জটিল বিষয়গুলো বুঝে-শুনে প্রতিটি ধারার পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেবেন? তিনি মনে করেন, যদি প্রতিটি ধারার ক্ষেত্রেই আলাদাভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা করতে হয়, তবে তা একটি অত্যন্ত জটিল ও প্রায় অসম্ভব প্রক্রিয়া হবে। তিনি জানান, এই জটিলতা সত্ত্বেও বিএনপি একটি সমঝোতামূলক অবস্থানে আসার জন্য বলেছে যে, যে দল যেখানে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, সেগুলোসহই গণভোটে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু জামায়াতের পক্ষ থেকে যেভাবে গণভোট এবং পিআর সিস্টেম নিয়ে অনড় অবস্থান নেওয়া হয়েছে, তা পুরো প্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করছে বলে তিনি মনে করেন।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন অন্তর্বর্তী সরকার এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করছে। জামায়াতে ইসলামী সনদে স্বাক্ষর করলেও তারা সনদের আইনি ভিত্তি হিসেবে ‘প্রধান উপদেষ্টার আদেশ’ এবং নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদের আইনি ভিত্তি স্পষ্ট না হওয়ায় এখনো স্বাক্ষর করা থেকেই বিরত রয়েছে।
এই বহুমুখী টানাপোড়েনের মধ্যে বিএনপির একজন নেত্রীর পক্ষ থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে এমন সরাসরি সমালোচনামূলক বক্তব্য জোটের অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। যদিও বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতের দাবিগুলোর বিরোধিতা করেনি, তবে রুমিন ফারহানার এই বক্তব্য দলের একটি অংশের মনোভাবের প্রতিফলন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে, জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হলেও এর বাস্তবায়নের পথ এখনো কণ্টকাকীর্ণ এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যেতে হলে দলগুলোর মধ্যে আরও গভীর বোঝাপড়া ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা প্রয়োজন। মিডিয়ার আলোচনায় উঠে আসা এই মতপার্থক্যগুলো দ্রুত নিরসন না হলে তা আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন