নভেম্বর ১০, ২০২৫, ০৮:৫৯ এএম
জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালে দেশব্যাপী কারফিউ জারি এবং আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর পরিকল্পনার তথ্য ফাঁস হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে সরাসরি এই কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। নির্দেশটি ছিল, “আজ রাতেই কারফিউ দিয়ে ওদের শেষ করে দিন।”
এই নির্দেশ কার্যকর করার পূর্বের আলোচনায় শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ দুই সহচর— তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মধ্যেকার টেলিফোন কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ একটি গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে।
অডিওটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যেখানে জুলাই আন্দোলনের সময়কার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফাঁস হওয়া এই ফোনালাপে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে সালমান এফ রহমানকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি উদ্ধৃতি জানাতে শোনা যায়, যেখানে বলা হয়, "আজ রাতেই কারফিউ দিয়ে এদের শেষ করে দেওয়া।
" উত্তরে সালমান এফ রহমানও নিশ্চিত করেন যে, আসাদুজ্জামান খান কামাল তাকেও প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর নির্দেশের বিষয়টি জানিয়েছেন। এই আলোচনায় দুই বিকল্প চিন্তার কথা উঠে আসে— যার একটি ছিল ‘আজ রাত্রেই কারফিউ দিয়ে আন্দোলনরত ছাত্রদের শেষ করে দেওয়া’ এবং অন্যটি ছিল ‘গো ফর দ্য রিয়েল হার্ডলাইন’। ফোনালাপে স্পষ্ট হয় যে, এই পরিকল্পনায় সেনাবাহিনীর (যা কথোপকথনে ‘নর্থ সাইড’ বা উত্তরপাড়া হিসেবে উল্লিখিত) সম্পৃক্ততার প্রয়োজন ছিল।
আনিসুল হক সালমানকে জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল মনে করেছিলেন যে, বিক্ষোভ দমনে 'নর্থ সাইড'কে অবশ্যই সম্পৃক্ত করতে হবে। সালমান এফ রহমান এই তথ্যের সঙ্গে তার পাওয়া তথ্যের মিল নিশ্চিত করেন। এই কথোপকথন এমন একটি সময়ে ঘটছিল যখন দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার আন্দোলন তুঙ্গে এবং সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চরম কঠোরতা অবলম্বনের পথে হাঁটছিল।
উল্লেখ্য, জুলাইয়ের এই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীনই আন্দোলনের তীব্রতা মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে সাবেক সরকার ১৯ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি করেছিল এবং সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। এর পর থেকেই আন্দোলন দমনে বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে, যা পরে ‘জুলাই গণহত্যা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। জাতিসংঘের তদন্ত রিপোর্টে এই গণহত্যায় ১৪০০ মানুষের নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত, অর্থাৎ ৫ আগস্ট পর্যন্ত এই কারফিউ বহাল ছিল। পরবর্তীতে সেনাপ্রধানের বক্তব্যে পরিস্থিতি শান্ত হলে কারফিউ তুলে নেওয়ার কথা বলা হয় এবং তা প্রত্যাহার করা হয়।
এই অডিও ফাঁস হওয়ার আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত আরও বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর ফোনালাপ জনসমক্ষে আসে, যার মধ্যে শেখ হাসিনার মার্শাল ল জারির পরিকল্পনা, বিক্ষোভে গুলি চালানোর নির্দেশ, আওয়ামী ক্যাডার দিয়ে হত্যাকাণ্ড এবং আন্দোলনকারীদের গণগ্রেপ্তার নিয়ে তৎকালীন নেতাদের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব ফোনালাপের প্রতিটিই জুলাই আন্দোলনের সময়কার সরকারি পদক্ষেপ ও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করে।
বর্তমান অডিও ক্লিপটি সেই ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনার বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করলো, যেখানে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে 'কারফিউ দিয়ে শেষ করে দেওয়ার' মতো কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। দেশের আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে একটি গণ-আন্দোলনকে দমন করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এটি জুলাই গণহত্যার দায়ভার নিরূপণে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে ওবায়দুল কাদের এবং ডিবিপ্রধান হারুনের ফোনালাপ, এমনকি ১৪ দলীয় জোট নেতা হাসানুল হক ইনুর শেখ হাসিনাকে করা ফোনও ফাঁস হয়েছিল, যা বিক্ষোভ দমনে সরকারের বিভিন্ন স্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টার সাক্ষ্য দেয়। এই নতুন ফাঁস হওয়া অডিওটি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য জুলাই গণহত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন