সোমবার, ০৫ অক্টোবর, ২০২৬,
বিশ্ব শিশু দিবস

বাংলাদেশে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশু দিবস

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ৫, ২০২৬, ১১:২৪ এএম

বাংলাদেশে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশু দিবস

ছবি: Ai

শিক্ষা, পুষ্টি, নিরাপত্তা ও সুযোগের বহুমুখী বৈষম্যের বাস্তবতা সামনে রেখে সোমবার (৫ অক্টোবর) বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশু দিবস। দেশে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার দিবসটি পালনের রেওয়াজ রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘ ও জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ২০ নভেম্বর বিশ্ব শিশু দিবস পালন করে থাকে। এ বছরের আন্তর্জাতিক বার্তায় প্রতিটি শিশুর বক্তব্য শোনা এবং তাদের মৌলিক অধিকার প্রতিদিন সুরক্ষার ওপর বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দিবস উদযাপনের পাশাপাশি শিশুদের সুরক্ষা ও সম-অধিকার নিশ্চিতের প্রশ্নটি জোরালো হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ শিশু তহবিলের যৌথ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেশের শিশুদের সামগ্রিক জীবনযাত্রার একটি বিস্তারিত পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। মোট ৬২ হাজার ৯৮০টি পরিবারের নমুনা নির্ধারণ করে ১৭৩টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে ৬১ হাজার ২০৭টি পরিবার থেকে সফলভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ৮৫ শতাংশ হলেও ওপরের শ্রেণিতে ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক। নিম্ন মাধ্যমিকে উপস্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ১ শতাংশে এবং উচ্চ মাধ্যমিকে তা নেমে এসেছে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশে। উচ্চ মাধ্যমিক বয়সের ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে। এ ছাড়া ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ভিত্তিগত পাঠদক্ষতা রয়েছে মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশের এবং ভিত্তিগত সংখ্যাগত দক্ষতা রয়েছে ৩৯ দশমিক ২ শতাংশের।

চাকরিজীবী অভিভাবক শাহানা জামান জানান, মা-বাবা দুজনই কর্মজীবী হলে সন্তানদের ঠিকমতো সময় দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পড়াশোনা, অনলাইন মাধ্যম, খাবার ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে বাড়তি সহায়তার দরকার পড়ে। সব পরিবার এই সহায়তা নিশ্চিত করতে পারে না বলে একই শহরের শিশুদের মধ্যেও জীবনমানের দৃশ্যমান পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।

এদিকে দেশে শিশুশ্রমের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জরিপ অনুসারে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯ দশমিক ২ শতাংশ সরাসরি শ্রমে যুক্ত। ২০১৯ সালের জরিপে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। কন্যাশিশুদের সার্বিক বিকাশে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে বাল্যবিবাহ। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। অন্যদিকে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত। ২০১৯ সালের তুলনায় সার্বিক হার কিছুটা কমলেও সংকট এখনো প্রবল।

শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও কোনো স্বস্তিদায়ক চিত্র মেলেনি। ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশই গত এক মাসে শারীরিক শাস্তি কিংবা মানসিক আগ্রাসনের মতো সহিংস শৃঙ্খলার মুখোমুখি হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধনের হার মাত্র ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ। অপর অভিভাবক ও জিম প্রশিক্ষক ফাহমিদা হক জানান, সন্তানকে ভালো খাবার ও উপযুক্ত বিদ্যালয়ে পাঠানোর চেষ্টা সত্ত্বেও শিশুর মানসিক বিকাশ, পারিবারিক সময় এবং সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে অভিভাবকেরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। কর্মজীবী মা-বাবার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সহযোগিতার কাঠামো আরও শক্তিশালী হওয়া আবশ্যক।

শিশুদের শারীরিক পুষ্টির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি বিদ্যমান। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৪ শতাংশ খর্বাকৃতির, ১২ দশমিক ৯ শতাংশ অতিরিক্ত রোগা এবং ২৩ শতাংশ স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজনের। ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য পাচ্ছে। সুস্থ পরিবেশের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা কাটেনি। উন্নত পানির উৎস ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। 

পানির বিদ্যমান উৎসের ৪৭ দশমিক ১ শতাংশেই ক্ষতিকর ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। একই সাথে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশের রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত প্রমাণ করে যে শিশুদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও বহুসংখ্যক শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে, অনিরাপদ পরিবেশে ও অপুষ্টিতে দিন কাটাচ্ছে। পারিবারিক বাস্তবতার বৈষম্য কমিয়ে প্রতিটি শিশুর অধিকার রক্ষাই চলতি বছরের বিশ্ব শিশু দিবসের মূল বার্তা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।