বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬,

নরেন্দ্র মোদিকে ঢাকার বার্তা দিল্লির বৈঠকে হাসিনাকে ফেরতসহ একাধিক শর্ত

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ৮, ২০২৬, ১১:০২ এএম

নরেন্দ্র মোদিকে ঢাকার বার্তা দিল্লির বৈঠকে হাসিনাকে ফেরতসহ একাধিক শর্ত

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে বিশেষ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে মোদির সাথে তার একান্ত সাক্ষাতের পর থেকে এই বার্তা নিয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, এই বার্তার অন্যতম দিক হলো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে একটি অনুকূল ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।

এর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি।

একই সাথে গ্যারান্টি ক্লজ বা নিশ্চয়তা বিধান যুক্ত করে গঙ্গার পানিবণ্টনের নতুন চুক্তি স্বাক্ষর এবং বাণিজ্য ও জ্বালানিসহ সব ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমতাভিত্তিক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব বার্তার মূল রাজনৈতিক দিকগুলো শীর্ষ নেতৃত্বকে সরাসরি অবহিত করতেই হাইকমিশনার ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎ করেন। দিল্লি সফরের আগে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন পক্ষের সাথে বিশদ আলোচনা করে ঢাকার প্রত্যাশা সম্পর্কে ধারণা নেন। তিনি ভারতের সেনাপ্রধান ধীরাজ শেঠের সাথেও দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে বৈঠক করেছেন।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঢাকার প্রধান বার্তা হলো আস্থা ফেরানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।

বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত তিনি যেন ভারতে অবস্থান করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়ে দিল্লির সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের আসামিদেরও ফেরত চায় ঢাকা। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ভারতের আটটি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও রয়েছে। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং জ্বালানি ও বাণিজ্য খাতে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ঢাকার একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি বছরের মধ্যেই ভারত সফরে যেতে পারেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে সফরের পূর্বশর্ত হলো, দেশের মানুষকে দেখানোর মতো সুনির্দিষ্ট কিছু অর্জন নিয়ে তাকে ফিরতে হবে। গত আগস্টে তিনি দিল্লি গেলে দেশে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা ছিল। ফলে সরকার তাড়াহুড়া না করে কার্যকর ও দৃশ্যমান ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছে।

ভারতের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপে ঢাকা ইতিবাচক মনোভাব দেখতে পাচ্ছে।

গত ২৯ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতারা দিল্লিতে একটি রাজনৈতিক সমাবেশ করতে চেয়েছিলেন, যা ভারতের পক্ষ থেকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার সাথে দলটির কার্যনির্বাহী কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও ভারত তাতে সায় দেয়নি। এমনকি ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ওই বৈঠকে যোগ দিতে যাওয়া নেতাদের ফ্লাইটে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়নি বৈধ নথিপত্র না থাকার কারণে, ফলে তাদের ট্রেনে ফিরতে হয়েছে।

এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরীয় সংলাপে দিনেশ ত্রিবেদী উল্লেখ করেছিলেন যে শেখ হাসিনা ভারতীয় কোনো বিশেষ বিমানে দিল্লি যাননি এবং তার ভারতে যাওয়ার বিষয়টি আগে থেকে তাদের জানা ছিল না। টিভির স্ক্রল দেখে তারা জানতে পারেন এবং বিমান নামার পর মানবিক বিবেচনায় অনুমতি দেওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না। ঢাকার কূটনৈতিক মহলে আরও আলোচনা রয়েছে যে সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মার্কিন দূতাবাসে শেখ হাসিনার আশ্রয়ের চেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।

দিল্লির সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে বাংলাদেশের উত্থাপিত শর্তগুলোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট মতামত চেয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন, নয়াদিল্লি বাংলাদেশের সাথে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী, যার ভিত্তি হবে দুই দেশের জনগণের সার্বিক কল্যাণ। আর শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে তিনি পুনরায় জানান যে আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ পর্যায়ে আসায় নতুন চুক্তির জোর দাবি তুলেছে ঢাকা।

ফারাক্কা পয়েন্টে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে পানি বণ্টনের বর্তমান চুক্তিতে প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে সমবণ্টন, ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশের জন্য ৩৫ হাজার কিউসেক এবং ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারতের জন্য ৪০ হাজার কিউসেক রেখে বাকি পানি বাংলাদেশকে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে প্রবাহ নামলে জরুরি বৈঠকে সমাধানের কথা থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট সুরক্ষাকবচ নেই। বর্তমানে উজানে পানির প্রবাহ হ্রাস এবং বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের বাড়তি পানির দাবির প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান চুক্তি কেবল নবায়ন না করে স্পষ্ট নিশ্চয়তাযুক্ত নতুন চুক্তি করতে চায় বাংলাদেশ।

রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার চেষ্টা করলে এবং ভারত তাতে কোনো সহায়তা দিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক সমঝোতা ছাড়া তিনি প্রবেশ করলে তাকে গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকরের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতেই তাকে প্রত্যর্পণ করা হবে—এমনটাই ঢাকার প্রত্যাশা।