অক্টোবর ১০, ২০২৫, ০৪:৩৯ পিএম
নির্বাচনের উত্তাপের মাঝে দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন নতুন এক বিতর্কের ঝড়। ইসলামী চিন্তাবিদ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুফতি আমির হামজা কর্তৃক মহানবী (সা.)-কে 'সাংবাদিক' হিসেবে আখ্যায়িত করার পর, তাকে 'কাফের' আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ ও বক্তা ডক্টর এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী। এই মন্তব্য ঘিরে ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে জামায়াতে ইসলামীর এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। বুধবার, ৮ অক্টোবর, অনুষ্ঠিত এই সভায় ইসলামী চিন্তাবিদ এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মুফতি আমির হামজা তার বক্তব্যে 'নবী' শব্দের শাব্দিক অর্থ বিশ্লেষণ করে এক বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আমরা যাকে নেতা হিসেবে মানি তিনি মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সা.)। ওনাকে আল্লাহ দুনিয়াতে যে নাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তা হলো নবী।
নবী শব্দের শাব্দিক অর্থ সংবাদবাহক। আর সংবাদ যারা বহন করেন তাদের আমরা সাংবাদিক বলি। এ অর্থে নবীজি (সা.) সাংবাদিক ছিলেন।” মুফতি আমির হামজা তার এই বক্তব্যকে কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে আরও জোরদার করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ নবীকে যেমন সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার কষ্টকর দায়িত্বের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন, তেমনি কিয়ামত পর্যন্ত যারা সততার সঙ্গে সাংবাদিকতার মতো এই দায়িত্ব পালন করবেন
, আল্লাহ তাদেরও পুরস্কৃত করবেন। তিনি আরও বলেন, সংবাদ সংগ্রহ ও সঠিক তথ্য তুলে ধরতে বিভিন্ন চাপ মোকাবেলা করে যে কষ্ট সাংবাদিকরা পান, তার পারিশ্রমিক আল্লাহ নিজে দেবেন। এই পারিশ্রমিককে তিনি 'গয়রা মামুন' বা নিরবিচ্ছিন্ন পুরস্কার হিসেবে বর্ণনা করেন, যা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানেই প্রাপ্য। তার মতে, 'নাবা ইলা আজিম' শব্দটি আধুনিক 'ব্রেকিং নিউজ'-এর সমার্থক এবং 'NEWS' শব্দের প্রতিটি অক্ষর (North, East, West, South) বিশ্বের সব সংবাদকে নির্দেশ করে।
মুফতি আমির হামজার এই মন্তব্যের পরই সারাদেশে এ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। সেই সমালোচনার পালে নতুন হাওয়া দেন বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ ও বক্তা ডক্টর এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী। তিনি মুফতি আমির হামজাকে 'পাগল' আখ্যা দেন এবং তার মন্তব্যকে সম্পূর্ণ 'মূর্খতা' হিসেবে অভিহিত করেন।
বুধবার, নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে আপলোড করা এক ভিডিওতে ডক্টর আব্বাসী স্পষ্ট ভাষায় মুফতি আমির হামজার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান।
ডক্টর এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী তার ভিডিও বক্তব্যে বলেন, "পাগলা পাগলা বক্তা সে বলছে নবী অর্থ সাংবাদিক বিশ্বনবীকে যেহেতু আল্লাহ দুনিয়ায় নবী করে পাঠিয়েছিলেন সাংবাদিক করে পাঠিয়েছিলেন জামায়েত নেতা ও ইসলামিক বক্তা আমির হামজাকে পাগল আখ্যা দিলেন বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ ও বক্তা ডক্টর এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী।
" তিনি আরও বলেন, "নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাংবাদিক ছিলেন এমন মন্তব্যের কারণে তাকে তওবা করারও আহ্বান জানান আব্বাসী। বলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে কেউ এমনটা বললে তার ঈমান থাকবে না কাফের হয়ে যাবে তওবা করা উচিত বক্তব্য প্রত্যাহার করা উচিত।"
ডক্টর আব্বাসী 'বার্তাবাহক' ও 'সাংবাদিক' এই দুই শব্দের মধ্যে আকাশ-জমিন পার্থক্য রয়েছে বলে জোর দেন। তিনি সরাসরি ফতোয়া না দিলেও বলেন, মিডিয়া সেল থেকে যে খবর এসেছে, তাতে বক্তা নবী শব্দের অর্থ সাংবাদিক উল্লেখ করেছেন। এই ধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণ মূর্খতা নির্দেশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বক্তা কি 'বাকুরাতুল আদব' পড়েননি? আরবি শিক্ষাও কি তার জানা নেই? তিনি জোর দিয়ে বলেন, "নবী অর্থ সাংবাদিক না, নবী অর্থ সংবাদবাহক।
ইংরেজিতে মেসেঞ্জার। সাংবাদিকের ইংরেজি শব্দ জার্নালিস্ট। কোন সংবাদবাহককে নবী বলা যাবে না।" তার মতে, এ ধরনের দাবি যারা করেন, তারা 'কাফের' হিসেবে গণ্য হবেন। তিনি বলেন, "আর যে কোন সংবাদবাহককে নবী বলা যাবে না। যে বলবে সে কাফের হয়ে যাবে।"
ডক্টর আব্বাসী তার বক্তব্যে আরও বলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে যারা সংবাদ বহন করে উম্মতের কাছে পৌঁছে দিতেন, তাদের নবী বলা হতো। আর সাংবাদিক শুধু সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার করেন। শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থ জানা না থাকলে এমন বক্তব্য দেওয়া যায় না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে যারা সংবাদ বহন করে উম্মতের কাছে আনতেন, তাদেরকেই নবী বলা হতো। সাংবাদিক শব্দের এমন ভুল ব্যবহার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদাকে অবমাননা করা হিসেবে গণ্য করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডক্টর আব্বাসী মুফতি আমির হামজার প্রতি তওবা করার এবং বক্তব্য প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "তিনি কোন তাফসীর বা হাদিস জ্ঞান ছাড়া আরবি শব্দের অর্থ না জেনে স্টেজে উঠে যা খুশি তা বলছেন। আল্লাহ তার হেদায়েত দান করুক।
" ডক্টর আব্বাসী আরও জানান যে, তিনি বক্তার জন্য বক্তব্য প্রত্যাহার ও সংশোধনের সুযোগ হিসেবে আজ শুধু সময় দিলেন। তার কথায়, "তাফসীরের কোন জ্ঞান নাই, হাদিসের কোন জ্ঞান নাই, আরবি লোগাতের কোন জ্ঞান নাই। ব্যাস স্টেজে উঠলো আর যা খুশি তা বলল।"
প্রসঙ্গত, কুষ্টিয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মাওলানা আবুল হাসেম। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের টিম সদস্য অধ্যক্ষ খন্দকার এ কে এম আলী মুহসিন।
কুষ্টিয়া জেলার চারটি সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীরা এবং কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকসহ স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এই সভাতেই মুফতি আমির হামজা তার আলোচিত মন্তব্যটি করেন। তার এই মন্তব্যের পর তীব্র সমালোচনা করে এনপিবি নিউজ জানায়, "আল্লাহর হাবীব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরশচুম্বি শানমান মর্যাদার দিকে নিজবত করা জঘন্যতম বেয়াদবি।"
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন রাজনৈতিক দলগুলো জনসমর্থন আদায়ে ব্যস্ত, তখন এই ধরনের ধর্মীয় ব্যাখ্যার অপব্যবহার অথবা ভুল ব্যাখ্যার কারণে সমাজে বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের এমন সংবেদনশীল বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকা উচিত বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এই বিতর্ক শুধু ধর্মীয় পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী হতে পারে।এসইও টাইটেল: আমির হামজাকে কাফের বললেন আব্বাসী: নবীকে সাংবাদিক বলায় বিতর্ক



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন