শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬,
রাজনৈতিক লংমার্চ

গণরায় না মানলে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের ডাক

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ০৯:৫৮ এএম

গণরায় না মানলে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের ডাক

শফিকুর রহমানের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব জনগণের দরজায় কড়া নাড়ছে। এই নতুন বিপ্লবের মুখোমুখি হতে তিনি মুক্তিকামী দেশবাসীকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। শনিবার সকালে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজপথে বুক চিতিয়ে লড়াই করে যারা জাতিকে সাময়িক মুক্তি এনে দিয়েছে, তাদের কারও ছলনায় কান দেওয়া যাবে না। সেই অর্জনকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে তরুণদের আরেকবার লড়াইয়ের ময়দানে নামতে হবে।

একই সঙ্গে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত সাত দফা দাবি অবিলম্বে মেনে নিতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি। আগামী ৯ নভেম্বর সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই সরকারকে গণভোটের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেন এই বিরোধীদলীয় নেতা। তা না হলে রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন তিনি।

সমাবেশে তিনি বলেন, সুস্থ ধারায় ফিরে এসে সংসদ অধিবেশনের আগেই ঘোষণা দিতে হবে যে গণরায় বাস্তবায়ন করা হবে। সরকার তা করলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপাতত নতুন কোনো কর্মসূচি দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু জনগণের ৭০ ভাগ মানুষের এই রায় ও অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

বৃহত্তর রাজনৈতিক ত্যাগের জন্য পুরো জাতিকে প্রস্তুত থাকার তাগিদ দেন জামায়াত আমির।

তিনি স্পষ্ট করেন, তারা কোনো সংকীর্ণ দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থে রাজপথে নামেননি। সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যেই এই কর্মসূচি। আগের দুটি লংমার্চের ধারাবাহিকতায় মহান আল্লাহর সাহায্য ও জনগণের ভালোবাসায় এই তৃতীয় লংমার্চও সফল হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ঘোষিত সাত দফার মূল ভিত্তি হিসেবে গণভোটের বাস্তবায়নকে চিহ্নিত করেন তিনি। তার দাবি, এই একটি গণরায় বাস্তবায়িত হলে বাকি ছয় দফার উদ্ভব হতো না এবং সমাজে কোনো চাঁদাবাজ, দখলদার, দুর্নীতিবাজ কিংবা মাদক কারবারি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না।

বক্তব্যে বিএনপির রাজনৈতিক ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা।

তার অভিযোগ, দলটি জনগণের সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রতারণা করেছে এবং দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। সংসদে দাঁড়িয়ে মিথ্যাচারের মাধ্যমে তারা জাতির সম্মিলিত গণরায়কে উপহাস করেছে। অতীতে স্বৈরাচারী শাসন কিংবা নিজেদের ভুলত্রুটি থেকে দলটি কোনো শিক্ষা নেয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চার দিনের বিদেশ সফর নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির।

দুই দিন আগে দেশে ফেরা প্রধানমন্ত্রীর সফরের উদ্দেশ্য ও অর্জন জাতির সামনে পরিষ্কার করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা বা লুকোচুরি চলছে কি না, তা জানতে চান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যোগাযোগের নামে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে কাউকে কোনো সুবিধা দেওয়া চলবে না। যারা দাসত্ব মেনে নিয়েছিল, তাদের বর্তমান পরিণতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

সকাল সাতটায় সমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের উদ্বোধনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে।

তিনি বলেন, অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করতে হবে, অন্যথায় সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে বলেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ডক্টর শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্য বক্তারাও কঠোর বার্তা দেন।

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছোবহানী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাগপার সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বিডিপির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান এবং খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম।

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম এবং ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। সমাবেশে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের বিশাল উপস্থিতি থাকলেও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।

সমাবেশ শেষে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে লংমার্চের গাড়িবহর ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকা ছেড়ে যায়।

চার শতাধিক কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথযাত্রায় ঢাকা থেকে ছয় শতাধিক এবং বিভিন্ন জেলা থেকে আরও প্রায় দেড় হাজার গাড়ি বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। মোট ১৯টি জেলার নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে এই বহর গঠিত হচ্ছে।

পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুসারে বহরটি ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু পার হয়ে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় সকাল নয়টায় প্রথম পথসভা করে।

এরপর বেলা ১১টায় বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড়, সাড়ে ১২টায় খুলনা মহানগরের বাবরী চত্বর এবং দুপুর দুইটায় ফুলতলার স্বাধীনতা চত্বরে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। বিকেলে সাড়ে তিনটায় যশোরের মুড়লীর মোড় এবং বিকেল পাঁচটায় ঝিনাইদহের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড মোড়ে পথসভা করার পর রাত সাড়ে আটটায় কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচি শেষ হবে।

আন্দোলনরত ১১ দলীয় ঐক্যের মূল সাত দফা হলো—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার সম্পন্ন করা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের সংকট দ্রুত নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, সব ধরনের দুর্নীতি, দখলদারি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন এবং প্রশাসনে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।