অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৮:১২ পিএম
দিনাজপুরের চিরিরবন্দর ও পার্বতীপুর সীমান্ত এলাকার পার্বতীপুর অংশে বাড়ি যাওয়ার পথ এবং নির্মাণসামগ্রী কেনার বিরোধকে কেন্দ্র করে মনোরঞ্জন রায় নামের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে পার্বতীপুর উপজেলার বেলাইচণ্ডী ইউনিয়নের রাবেয়ার মোড় সংলগ্ন সোনাপুকুর নয়া মোল্লাপাড়ায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত মনোরঞ্জন রায় চিরিরবন্দর উপজেলার ইসবপুর ইউনিয়নের চকসুকদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
তিনি একই উপজেলার চকসুকদেবপুর মালিপাড়া এলাকার অসীম চন্দ্র রায়ের ছেলে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ছেলে চন্দন কুমার রায় বাদী হয়ে পার্বতীপুর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনার পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে আসাদুজ্জামান নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে। পরবর্তীতে গভীর রাতে চিরিরবন্দর উপজেলার ৩ নম্বর ফতেজংপুর ইউনিয়নের বড় হাশিমপুর সরকারপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনায় জড়িত আলম হোসেন আলোকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে জানা যায়, নিহত শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়ের সঙ্গে নয়া মণ্ডলপাড়ার বাসিন্দা প্রয়াত আজিজুর রহমানের কলেজজীবন থেকেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। আজিজুর রহমান অসুস্থতার কারণে মারা যাওয়ার পর সমসাময়িক বন্ধুরা মিলে আজিজুরের পরিবারের দেখভালের দায়িত্ব দেন শিক্ষক মনোরঞ্জনকে, কারণ ওই বাড়ির পাশেই মনোরঞ্জনের কিছু জমি রয়েছে। সেই সূত্র ধরে পরিবারটির সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। অন্যদিকে আজিজুরের স্ত্রী রোমানা বেগম পার্শ্ববর্তী ফরতাজ হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে ধর্মপিতা হিসেবে গ্রহণ করলে ফরতাজও ওই বাড়িতে প্রায়ই যাতায়াত করতেন।
কয়েক মাস আগে রোমানা বেগম ও তাঁর সন্তানেরা পুরোনো ভিটে ভেঙে নয়া মোল্লাপাড়ার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নতুন বাড়ি নির্মাণকাজ শুরু করেন। এতে প্রতিবেশী মোস্তাহার, আলম হোসেন, আসাদুজ্জামান ও শরিফুল ইসলামের বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। যাতায়াতের পথ নিয়ে ওই পরিবারের সঙ্গে চরম বিরোধ তৈরি হয় এবং পর্যাপ্ত জায়গা না ছেড়ে বাড়ি নির্মাণের পেছনে শিক্ষক মনোরঞ্জন রায় পরামর্শ দিয়েছেন অভিযোগ করে প্রতিবেশীরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন।
এর পাশাপাশি বাড়ি তৈরির কাঠ, বাঁশের বাতা, খুঁটি ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী কেনা এবং শ্রমিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ফরতাজ হোসেন বেশি খরচের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়ের দেওয়া সাশ্রয়ী প্রস্তাব গ্রহণ করে মালামাল কেনেন রোমানা বেগম। এতে ফরতাজ চরম ক্ষুব্ধ হন। ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে ফরতাজ ওই বাড়িতে এসে রোমানার সঙ্গে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ শুরু করেন। রোমানা প্রতিবাদ করলে ফরতাজ তাঁকে মারধর করেন।
বিষয়টি ফোনে শিক্ষক মনোরঞ্জনকে জানানো হলে তিনি প্রয়াত আজিজুরের বড় ভাইকে সাথে নিয়ে ওই বাড়িতে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছামাত্র ফরতাজ শিক্ষক মনোরঞ্জনকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন এবং অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তোলেন। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে শিক্ষক মনোরঞ্জন ফরতাজকে একটি চড় মারেন। এতে ফরতাজ ক্ষিপ্ত হয়ে পাশের বাড়ির মোস্তাহার, তাঁর ছেলে আলম হোসেন, আসাদুজ্জামান ও প্রতিবেশী শরিফুলকে ডেকে আনেন।
তাঁরা বাঁশের খুঁটি, কাঠের বাটাম ও লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে শিক্ষক মনোরঞ্জনকে এলোপাতাড়ি পেটাতে শুরু করেন। আজিজুরের ভাই, স্ত্রী ও সন্তানেরা বাধা দিতে গেলে তাঁদেরও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে মোস্তাহারের স্ত্রী আরজু বেগম, আলমের স্ত্রী শারমিন এবং প্রতিবেশী মিনু আরা ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রাণ বাঁচাতে শিক্ষক মনোরঞ্জন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে হামলাকারীরা গাছের ডাল ভেঙে তাঁর পেছনে ধাওয়া করে এবং মারতে মারতে প্রায় দেড়শ মিটার দূরে একটি ধানক্ষেতে ফেলে চলে যায়।
গ্রামবাসীরা প্রথমে ভেবেছিলেন শিক্ষক পালিয়ে গেছেন। পরে দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে একটি ছেলে ধানক্ষেতের পাশে ঘাস কাটার সময় মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার দিলে পরিবারের সদস্যরা গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। খবর পেয়ে পার্বতীপুর মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং আসাদুজ্জামানকে হেফাজতে নেয়।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আনোয়ার হোসেন জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে সংবাদ পেয়ে পার্বতীপুর মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করে।
পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াদুদ জানান, নিহতের ছেলের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এজাহারভুক্ত অন্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন