বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬,

পোশাক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে ৩ টি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের শীর্ষ খাত

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৮, ২০২৬, ১০:১২ এএম

পোশাক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে ৩ টি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের শীর্ষ খাত

ছবি: সংগৃহীত

পোশাক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে তীব্র জ্বালানি সংকট, বিদেশি ক্রেতাদের মূল্যহ্রাসের চাপ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটি এখন মূলত ত্রিমুখী চাপের মুখে পড়েছে—বিদেশি অর্ডারে বড় ধাক্কা, অস্বাভাবিক উৎপাদন ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার তীব্র প্রতিযোগিতা। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সরবরাহ ঘাটতির কারণে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে ব্যয় বহুগুণ বেড়ে চলেছে।

টেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশিকুর রহমান তুহিন সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ক্রেতারা পণ্যের দাম কমানোর জন্য অনবরত চাপ দিচ্ছেন। পশ্চিমা বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা আগের চেয়ে কম দামে পোশাক কিনতে চাইছেন, যার ফলে রপ্তানিকারকদের মুনাফার সীমা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।

পোশাক খাতে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ক্রেতাদের অর্ডার ধরে রাখা নিয়ে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বিকেএমইএর সাম্প্রতিক এক জরিপে অংশ নেওয়া নিট পোশাক কারখানাগুলোর ৫৫ শতাংশ জানিয়েছে, বিদেশি ক্রেতারা তাদের নিয়মিত অর্ডার কমিয়েছেন কিংবা বাতিল করেছেন। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ফলে ৮৭ শতাংশ কারখানা নির্ধারিত সময়ে পণ্য রপ্তানি করতে গিয়ে বিলম্বের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক পোশাক বাণিজ্যে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় ক্রেতাদের আস্থায় বড় ধরনের টান পড়ছে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, আন্তর্জাতিক কিছু ক্রেতা ও ব্র্যান্ড নিজস্ব সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে এখন এক দেশের ওপর নির্ভর না করে একাধিক দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করছে। এর ফলে বাংলাদেশের বেশ কিছু নিয়মিত অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব অর্ডার একযোগে দেশ ছাড়ছে; বরং ক্রেতারা এখন বিকল্প দেশগুলোর সক্ষমতা কঠোরভাবে যাচাই করছেন।

জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এখন প্রধান সংকট হয়ে উঠেছে।

বিকেএমইএর জরিপে অংশ নেওয়া ৭৮ শতাংশ নিট কারখানা নিশ্চিত করেছে যে জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের কারখানার উৎপাদন আংশিক বন্ধ রাখতে হয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ কারখানা সরাসরি বিদ্যুৎ ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজেলচালিত জেনারেটর এবং এলপিজি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখতে হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাবদ পরিচালন ব্যয় আকাশচুম্বী করে তুলছে। একই সাথে সার্বিক উৎপাদন সক্ষমতাও কমছে।

বাড়তি এই খরচের বোঝা বিদেশি ক্রেতাদের ওপর চাপানোর কোনো সুযোগ নেই। মূল্যস্ফীতি ও অতিরিক্ত মজুদের অজুহাতে ব্র্যান্ডগুলো উল্টো আগের চেয়েও কম দাম প্রস্তাব করছে। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তাই এখন খাতের প্রধান উদ্বেগ। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না, যা অর্ডার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি আরও বলেন, ক্রেতারা এখন দামের চেয়ে সময়মতো ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন; এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রতিযোগী দেশগুলো সেই সুযোগ কাজে লাগাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও সতর্কসংকেত দিচ্ছে।

মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৪৯৬ কোটি ডলার থেকে কমে প্রায় ৪৬৫ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট বৈশ্বিক পোশাক আমদানি কমার পাশাপাশি চীনের রপ্তানিতেও বড় পতন ঘটেছে, ফলে সংকুচিত বাজারে বাংলাদেশ এখনও একটি প্রধান সরবরাহকারী দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নলেজ হাবের সভাপতি ও সিপিডির সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, চীন যে বাজার হারিয়েছে তার পুরো সুবিধা বাংলাদেশ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যেখানে ভিয়েতনাম নিজেদের বাজার ধরে রেখেছে এবং ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া কিছু ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তিনি জানান, দেশের পোশাক খাতের সমস্যা নিছক সাময়িক জ্বালানি সংকট নয়; উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘ লিড টাইম এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে প্রতিযোগিতা অনেক কঠিন হয়ে গেছে। দ্রুত উৎপাদনশীলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা না বাড়ালে বৈশ্বিক বাজারের অংশ ধরে রাখা অসম্ভব হবে।

চাপের মুখেও তৈরি পোশাক খাতের কর্মসংস্থানে একধরনের মিশ্র চিত্র দেখা গেছে।

বিজিএমইএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন প্রতিকূলতায় ৩০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং এতে কাজ হারিয়েছেন প্রায় ১৪ হাজার শ্রমিক। বিপরীতে একই সময়ে ৫৩টি নতুন কারখানা বিজিএমইএর সদস্যপদ পেয়েছে, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার কর্মীর। অর্থাৎ কিছু কারখানা বন্ধ হলেও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, যদিও উৎপাদন সংকট দীর্ঘ হলে নতুন বিনিয়োগের গতিও ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে।

সার্বিক সংকট মোকাবিলায় কেবল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, অবিলম্বে গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিতের পাশাপাশি বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার জটিলতা কমিয়ে লিড টাইম কমাতে হবে। একই সাথে স্বল্পমূল্যের পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃত্রিম তন্তু, উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি এবং অপ্রচলিত নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে, যা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা বাড়াবে।