অক্টোবর ৮, ২০২৬, ১১:৩৯ এএম
ভারতীয় চলচ্চিত্রের নিজস্ব ধারার কিংবদন্তি অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে গোয়ার নিজ বাসভবনে গুরুতর হৃদ্যন্ত্রের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয় বলে ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআই নিশ্চিত করেছে।
তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল কয়েক দশকের এক বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময় অভিনয় অধ্যায়ের।
পর্দার অভিনয়ে সংলাপ ছোড়ার নিজস্ব ভঙ্গি আর চোখের তীব্র অভিব্যক্তিতে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। কখনো কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, কখনো ভয়ংকর খলনায়ক, আবার কখনো নিখাদ কৌতুক চরিত্রে সাবলীল উপস্থিতি দিয়ে তিনি একাধিক প্রজন্মের দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছিলেন।
তবে পর্দার এই সাফল্যের পেছনের গল্পটি ছিল নিদারুণ সংগ্রামের।
নানা পাটেকরের শৈশব কেটেছে তীব্র আর্থিক অনটনের ভেতর দিয়ে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের হাল ধরতে তাকে উপার্জনের পথে নামতে হয়। একসময় মাসে তার আয় ছিল মাত্র ৩৫ রুপি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছিলেন, চরম অর্থকষ্টে দিনে মাত্র একবার খাবার খেয়েও পার করতে হয়েছে দিন। সেই দারিদ্র্য আর কঠিন বাস্তবতা সত্ত্বেও তিনি অভিনয়ের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন।
‘গমন’ সিনেমায় একটি নেতিবাচক চরিত্রের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে তার আনুষ্ঠানিক অভিষেক ঘটেছিল।
তবে ১৯৮৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অঙ্কুশ’ সিনেমাটি তাকে রাতারাতি পরিচিতি এনে দেয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই শক্তিমান অভিনেতাকে। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নি সাক্ষী’, ‘তিরঙ্গা’, ‘খামোশি’ এবং ‘ভূত’-এর মতো কালজয়ী সিনেমাগুলোতে তার অনবদ্য অভিনয় বলিউডে তার অবস্থানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
গম্ভীর চরিত্রের খোলস ভেঙে তিনি কৌতুক অভিনয়েও সমান মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। ‘ওয়েলকাম’ সিনেমায় খলচরিত্র উদয় শেঠির ভূমিকায় তার হাস্যরসাত্মক সংলাপ আজও দর্শকদের মুখে মুখে ফেরে। এরপর ‘শাগির্দ’, ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’ এবং ‘অ্যাব তক ছাপ্পান’-এর মতো সিনেমায় একদম ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি দেশের সামরিক বাহিনীর সাথেও সরাসরি জড়িয়ে ছিল তার জীবন।
১৯৯০ সালে তিনি ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মিতে যোগ দেন। নিজের পরিচালিত ও অভিনীত ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ সিনেমায় মেজরের চরিত্রে নিখুঁত অভিনয়ের জন্য তিনি দীর্ঘ তিন বছর বাস্তব সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। সে সময় তিনি জেনারেল ভি কে সিংয়ের সঙ্গেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের সময় অভিনয় থেকে দূরে সরে মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের সাথে যুক্ত হয়ে সরাসরি কাজ করেছিলেন তিনি।
হিন্দি চলচ্চিত্রের বাইরে মারাঠি সিনেমায় তার অবদান অবিস্মরণীয়। বিশেষ করে ২০১৬ সালের ‘নাটসম্রাট’ চলচ্চিত্রে থিয়েটার থেকে অবসর নেওয়া এক বৃদ্ধ মঞ্চ অভিনেতার ট্র্যাজেডি তিনি রূপালি পর্দায় তুলে ধরেছিলেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি তিনবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে ভারতের মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সুবেদার’ ও ‘ও রোমিও’ ছিল তার জীবনের শেষ দিকের অভিনীত কাজ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন