নভেম্বর ১, ২০২৬, ১১:৩৫ এএম
ইউরোপের বাজারে সস্তা তৈরি পোশাক ও ফ্যাশন পণ্যের ব্যবসায় একটি বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। স্বল্পমূল্যের আমদানি পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক ও অতিরিক্ত সেবামূল্য নির্ধারণ করায় চীন থেকে সরাসরি আসা ছোট পার্সেলের ব্যবসা তীব্র চাপে পড়েছে। এর প্রভাবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে চীন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে স্বল্পমূল্যের বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনে আকাশপথের কার্গো প্রবাহ কমেছে ৫০ শতাংশ। এতে ইউরোপের বাজারে চীনের অতি সস্তা পোশাকের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় থাকা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অ্যাভিয়েশন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যাভিয়ানের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে এই হিসাব পাওয়া গেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন শুল্ক কাঠামোর কারণে চীন থেকে আকাশপথে সরাসরি পণ্য সরবরাহের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াটি এখন বড় আর্থিক ব্যয়ের মুখে পড়েছে। নতুন নিয়ম অনুসারে গত ১ জুলাই থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে স্বল্পমূল্যের প্রতিটি আমদানি পণ্যের ওপর ৩ ইউরো শুল্ক কার্যকর করা হয়েছে। প্রতিটি পার্সেলের ভেতরে থাকা পণ্যের শ্রেণি অনুসারে এই অর্থ আদায় করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে চালু হওয়া এই কাস্টমস ব্যবস্থা ২০২৮ সালের জুলাই পর্যন্ত বহাল রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে জোটটি। এর পাশাপাশি ১ নভেম্বর থেকে আমদানি পণ্যের ওপর আরও ২ ইউরো হ্যান্ডলিং ফি কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন।
এই নতুন শুল্কনীতির সার্বিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল জানান, কোনো একটি পণ্যের বিক্রয়মূল্য ৫ ইউরো হলে তার ওপর ৩ ইউরো শুল্ক পুরোপুরি ক্রেতার কাঁধে চাপালে মোট মূল্য বেড়ে দাঁড়াবে ৮ ইউরো। অর্থাৎ দাম বাড়বে ৬০ শতাংশ। একইভাবে ১০ ইউরোর একটি পণ্যে শুধু শুল্কের কারণে মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে ৩০ শতাংশ। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়া ২ ইউরো হ্যান্ডলিং ফি হিসাব করলে ক্রেতার মোট ক্রয়ব্যয় আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মূলত চীনের অনলাইন বিপণন প্ল্যাটফর্মগুলো বিভিন্ন কারখানা থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে নামমাত্র মূল্যে ফ্যাশনপণ্য সরবরাহ করে ইউরোপের বাজারে নিজেদের একটি শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছিল। তাদের পুরো ব্যবসায়িক অবকাঠামো দাঁড়িয়ে ছিল অত্যন্ত কম দাম, দ্রুততম সরবরাহ এবং লাখ লাখ ছোট পার্সেল পাঠানোর সুবিধার ওপর। কিন্তু নতুন শুল্ক ও ফি যুক্ত হওয়ায় এই ব্যবসায়িক ধারার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে ইউরোপীয় ভোক্তাদের আগের মতো সস্তায় পণ্য দেওয়া তাদের জন্য ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতিকে ইতিবাচক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। মহিউদ্দিন রুবেল জানান, দেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা সাধারণত নামিদামি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, বড় আমদানিকারক ও পাইকারি ক্রেতাদের মাধ্যমে সরাসরি জাহাজে বা বড় চালানে পণ্য পাঠিয়ে থাকেন। লাখ লাখ ছোট পার্সেল আকাশপথে উড়িয়ে সরাসরি বিদেশি ভোক্তার কাছে খুচরা বিক্রির ওপর বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য নির্ভর করে না। যে কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই ছোট পার্সেলকেন্দ্রিক শুল্কনীতির কোনো সরাসরি নেতিবাচক ধাক্কা বাংলাদেশের কারখানার ওপর পড়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে।
বাজার বিশ্লেষকদের অভিমত, ইউরোপে অস্বাভাবিক কম দামের চীনা পণ্যের অপ্রতিরোধ্য আধিপত্য কমে এলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা আরও বাড়বে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে ক্রেতারা যখন পণ্যের টেকসই মান, আন্তর্জাতিক শ্রম আইন, পরিবেশবান্ধব কর্মপরিবেশ এবং নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ধারাকে অগ্রাধিকার দেবেন, তখন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকবেন। তবে এই নতুন বাজার-সুবিধা কাজে লাগাতে হলে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহ ও মানোন্নয়নের দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন