এপ্রিল ৬, ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম
অফিসে নির্ধারিত আট ঘণ্টা কাজ করার কথা থাকলেও বর্তমানে সেটি অনেক ক্ষেত্রেই ১০ থেকে ১২ ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকেছে। ক্যারিয়ারের উন্নতি আর কর্মক্ষেত্রের বাড়তি চাপের কারণে এই দীর্ঘ সময় কাজ করা এখন এক ধরণের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে এই অভ্যস্ততা যে মানুষের জীবনের জন্য কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, তা নিয়ে সম্প্রতি বড় ধরণের সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও।
সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি মনে করছে, অতিরিক্ত কাজের এই সংস্কৃতি নীরব ঘাতক হিসেবে আমাদের সমাজকে গ্রাস করছে।
ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন বা আইএলও-এর সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে ২০১৬ সালে অতিরিক্ত কাজের কারণে স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় সাত লাখ ৪৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
জাপানে এই ধরণের মৃত্যুকে `কারোশি` বলা হয়, যা মূলত অতিরিক্ত খাটুনির ফলে অকাল মৃত্যুকে নির্দেশ করে। ২০১৭ সালের এক সরকারি হিসাবে দেশটিতে ২৩৬ জন মানুষ কেবল কাজের চাপের কারণেই মারা গেছেন। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন তাদের তুলনায় যারা সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাজ করেন, তাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ এবং হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেড়ে যায়।
এই মৃত্যুর মিছিল কিন্তু হঠাৎ করে তৈরি হয় না। দীর্ঘ সময় কাজের প্রভাব শরীরে জমতে থাকে এবং প্রায় ১০ থেকে ২০ বছর পর তা বড় ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নেয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ এই ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যুবরণকারীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই মধ্যবয়সী বা বয়স্ক পুরুষ। ব্রিটেনের এক ব্যাংক কর্মকর্তা জনাথন ফ্রস্টিকের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ হতে পারে।
প্রতিদিন জুম মিটিং আর কাজের চাপে হার্ট অ্যাটাকের শিকার হওয়ার পর তিনি তার জীবনের দর্শনই বদলে ফেলেছেন।অতিরিক্ত কাজ শরীরের ক্ষতি করে দুইভাবে। প্রথমত এটি সরাসরি মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়, যা থেকে অবসাদ ও উদ্বেগ তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত এর পরোক্ষ প্রভাবে মানুষের খাদ্যাভ্যাস নষ্ট হয়, ব্যায়ামের সময় থাকে না এবং ঘুমের প্রচণ্ড অভাব দেখা দেয়। অনেকে স্ট্রেস কমাতে ধূমপান বা মদ্যপানের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যা হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
করোনা মহামারির পর থেকে `ওয়ার্ক ফ্রম হোম` সংস্কৃতির কারণে অফিস ও ব্যক্তিগত সময়ের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে গেছে, যা কর্মীদের ওপর মানসিক চাপ আরও ঘনীভূত করেছে।ঢাকার এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাহাত হোসেনের অভিজ্ঞতাও অনেকটা একই রকম। সপ্তাহে ৬০ থেকে ৬৫ ঘণ্টা কাজ করতে করতে তিনি এক সময় চরম বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত নিজের সুস্থতা রক্ষায় তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
গবেষকরা বলছেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়লেও সুস্থতা কমছে। বিশেষ করে এলন মাস্কের মতো সফল ব্যক্তিদের অতিমাত্রায় কাজের চাপ নেওয়ার সংস্কৃতি অনেক কর্মীর মাঝে ভুল ধারণা তৈরি করছে।এর সমাধানের পথ হিসেবে অনেক দেশ এখন সপ্তাহে চার দিনের কর্মসপ্তাহ নিয়ে গবেষণা করছে। দেখা গেছে যে কাজের সময় কমিয়ে আনলে উৎপাদনশীলতা কমে না, বরং কর্মীদের মানসিক সন্তুষ্টি ও শারীরিক সুস্থতা বৃদ্ধি পায়।
যারা আট ঘণ্টার কম কাজ করেছেন তাদের ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যা ও ক্লান্তি অনেক কম দেখা গেছে। তাই সুস্থ থাকার জন্য কাজ ও জীবনের মধ্যে ভারসাম্য ফেরানো এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে যে কাজ জীবনের একটি অংশ মাত্র, এটিই পুরো জীবন নয়। সুস্থ থাকাটাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সাফল্য।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন