অক্টোবর ৫, ২০২৬, ১০:১১ পিএম
ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লি ও মুম্বাইয়ে টানা কয়েক দিন ধরে তুমুল বিক্ষোভ চলছে। পুলিশের কঠোর বাধা, গণআটক এবং নারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে এই আন্দোলন আরও জোরালো রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে আগামী ১০ অক্টোবর রাজধানী দিল্লিতে আবারও বড় ধরনের বিক্ষোভ ও গণমিছিলের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি এবং কয়েকটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন।
গত ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন টানা তিন দিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান এই কর্মসূচিকে ‘যন্তর-মন্তর ২.০’ হিসেবে অভিহিত করছেন। দিল্লি পুলিশ এবার শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীদের কাউকেই নির্ধারিত যন্তর-মন্তরে পৌঁছাতে দেয়নি।
রোববার দিল্লিতে সাধারণ নাগরিক, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের উদ্যোগে ইন্ডিয়া গেট থেকে যন্তর-মন্তর অভিমুখে ‘সিটিজেন্স মার্চ’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জমায়েত হন। এর আগের দিন দায়িত্ব পালনকালে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে কয়েকজন নারী সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার জেরে রোববার বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন কলেজে নারী নিরাপত্তার দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের সাথে যন্তর-মন্তরের পুলিশি নির্যাতনের ক্ষোভ একাকার হয়ে গেছে।
ছাত্র সংগঠন আইসার নেত্রী নেহা বোরা অভিযোগ করেন, তাকে যে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়েছিল সেখানে কোনো নারী পুলিশ সদস্য ছিলেন না। পরবর্তীতে তাকে যন্তর-মন্তর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নির্জন নারেলা এলাকায় নিয়ে কোনো ফোন বা যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াই ফেলে দেওয়া হয়। আম আদমি পার্টির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীও ইন্ডিয়া গেটে বিক্ষোভস্থলে যোগ দেন। সেখান থেকে দলটির দিল্লি প্রদেশ সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজকে পুলিশ আটক করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিওতে সৌরভ ভরদ্বাজ অভিযোগ করেন, গণমাধ্যমের ক্যামেরায় যাতে তার মুখ ধরা না পড়ে সেজন্য পুলিশ তাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে পা ধরে টেনে নিয়ে যায়।
সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব অভিযোগ করে বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে যন্তর-মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় তাদের জোরপূর্বক আটক করা হয়েছে। এটি একদিনের কোনো প্রতীকী প্রতিবাদ নয় এবং জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে অপসারণ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। রোববার সন্ধ্যায় ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে পৃথক মিছিল বের করা হয়। ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে তার অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করে সংগঠনটি। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তারা যন্তর-মন্তর চত্বর অবিলম্বে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা এবং জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেপ্তারের দাবিতে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেয়।
মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে ‘গর্জনা মোর্চা’ আয়োজন করে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা ও রাজ ঠাকরের মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা বা এমএনএস। যৌথ এই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দুই ঠাকরে নেতাই সরাসরি মাঠে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজি পার্কেও পুলিশের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বানে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে মন্তব্য করেন, সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতার কারণে দুই মাসের মধ্যে তাদের দ্বিতীয়বারের মতো রাজপথে নামতে হয়েছে। তিনি বলেন, মহাত্মা গান্ধী যদি ভারতের আত্মা হন, তবে ড. বি আর আম্বেদকর দেশটির মেরুদণ্ড। আম্বেদকর ও জওহরলাল নেহরুই ভারতীয় নাগরিকদের ভোটাধিকার সুরক্ষিত করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। মুম্বাইয়ের ওই সমাবেশে বিশিষ্ট অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, অভিনেত্রী শাবানা আজমি এবং সুরকার ও সংগীতশিল্পী বিশাল দাদলানি সশরীরে উপস্থিত থেকে সংহতি জানান।
মুম্বাইয়ের এই কর্মসূচির সফলতার পর সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লিতে আবারও মেগা আন্দোলনের ডাক দেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি দেশবাসীকে প্রস্তুতি নিয়ে দ্রুত দিল্লি পৌঁছানোর জোরালো আহ্বান জানান। দিল্লিতে যন্তর-মন্তরে পৌঁছানোর সব পথ বন্ধ করতে দিল্লি মেট্রোর ১০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপরও পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে মানুষ এগোনোর চেষ্টা করলে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। এ সময় নেহা বোরা, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, যোগেন্দ্র যাদব, সৌরভ ভরদ্বাজ এবং আপ নেতা সঞ্জয় সিংসহ শীর্ষ নেতাদের আটক করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায় পুলিশ।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের নির্বাচন কমিশন গত শুক্রবার সকালে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে বাদ পড়া নামগুলো পুনরায় যুক্ত করতে একটি বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে। এর আওতায় ভোটার তালিকা নিবিড় যাচাই, বাদ পড়া ভোটারদের শনাক্ত করে ফরম-৬ পূরণ করানোর নির্দেশ জারি করা হয়। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বুথ লেভেল অফিসাররা ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য যাচাই করবেন এবং তরুণ ভোটারদের অন্তর্ভুক্তিতে বুথ পর্যায়ে বিশেষ শিবির করা হবে।
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবির পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি বিশদ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। সেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের মতামত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে গেছেন। গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের নানা নীতি ও পদক্ষেপ নিয়ে অন্য দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত বছরের এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত এই দুই কমিশনারকে না জানিয়েই কার্যকর করা হয়। নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ব্যাপক হারে ভোটারদের নাম কর্তন এবং অননুমোদিত পদক্ষেপে তারা তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পরই ভারতের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং ককরোচ জনতা পার্টি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে একযোগে রাজপথে নামে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন