অক্টোবর ৯, ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম
ভারতে ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তাল হয়ে উঠেছে। দেশজুড়ে প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের এই প্রক্রিয়ায় খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাগরিকের নাম বাদ পড়েছে। এর প্রতিবাদে রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও একাধিক অধিকার সংগঠন। তাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপিকে আসন্ন নির্বাচনগুলোতে অন্যায্য রাজনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দিতেই পরিকল্পিতভাবে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ভোটার তালিকা থেকে একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের পেশাগত নিরপেক্ষতা নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী জোট। এই পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের তাৎক্ষণিক অপসারণের দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে।
মূলধারার বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) শনিবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্যাপক বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়। তবে দিল্লি পুলিশ এই সমাবেশের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়নি। সিজেপি দাবি করেছে, কর্মসূচি বানচাল করতে তাদের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে পুলিশ আগেই আটক করেছে।
নির্বাচন কমিশনের বরাতে বিজেপি জানিয়েছে, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা সংখ্যায় জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। ক্ষমতাসীন দলের দাবি, বাদ পড়াদের মধ্যে প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ ভোটার ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন, ছয় কোটি ৩০ লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গেছেন, এক কোটি ভোটারের নাম একাধিকবার তালিকাভুক্ত ছিল এবং প্রায় তিন কোটি ভোটারকে মাঠপর্যায়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, এই সমন্বয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের ভোটারদের সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করা হয়েছে। তাদের দাবি, যেসব এলাকায় ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সমর্থন না করার প্রবণতা বেশি, সেখানকার ভোটারদের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলে নির্বাচনি ফলাফলে প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের তথ্যও এখন প্রকাশ্যে।
গত সেপ্টেম্বরের শেষভাগে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ভোটার নিবন্ধন, তালিকা সংশোধন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে কমিশনের দুজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য একাধিকবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। প্রায় ১০ মাসের ব্যবধানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো হলেও তা গুরুত্ব পায়নি বলে জানা গেছে। এই তথ্য ফাঁসের পর বিরোধীরা কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আরও সোচ্চার হয়।
পাল্টা বক্তব্যে নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণে সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয় এবং সব সিদ্ধান্ত প্রচলিত আইনি কাঠামো মেনেই নেওয়া হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে সংস্থাটি। বিজেপির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ করতেই বিরোধীরা পরিকল্পিত বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
আসন্ন রাজ্য নির্বাচনগুলোকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক নতুন রূপ নিয়েছে।
আগামী বছরের শুরুর দিকে ভারতের অন্তত সাতটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির সবচেয়ে জনবহুল এবং জাতীয় রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক রাজ্য উত্তর প্রদেশ। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে উত্তর প্রদেশে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের কাজ শুরুর পর সেখান থেকেই প্রায় ১৩ শতাংশ নাম বাদ পড়েছে। বাদ পড়া ব্যক্তিদের তালিকায় নাম পুনর্বহাল করতে নিজের পরিচয় ও নাগরিক যোগ্যতার কঠিন প্রমাণপত্র দাখিল করতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিহার ও পশ্চিমবঙ্গসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে লাখ লাখ ভোটার ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন বলে বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, নাম সংশোধনের এই দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিয়ম আগামী নির্বাচনের ফলাফলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
ভারতের নির্বাচনি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ভোটারের মৃত্যু হলে, দ্বৈত নিবন্ধন থাকলে, স্থায়ী ঠিকানা বদল করলে বা সংশ্লিষ্ট ঠিকানায় তাকে পাওয়া না গেলে তালিকা থেকে নাম কর্তন করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণ নথিভুক্ত করা বাধ্যতামূলক। তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে অন্তর্ভুক্তির আবেদন ও প্রয়োজনে আপিল করার আইনি সুযোগ থাকে। তবে বিরোধীদের যুক্তি হলো, এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল হওয়ায় প্রান্তিক মানুষের পক্ষে পুনরায় ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া বাস্তবে অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা প্রায় ১২ বছরের শাসনামলে ভোটার তালিকা সংস্কারের এই সংকট অন্যতম গভীর রাজনৈতিক বিরোধে রূপ নিয়েছে। গত বছর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বিরোধীদের অভিযোগ হলফনামা আকারে জমা দেওয়ার আহ্বান জানালেও আস্থার সংকট কাটেনি।
এদিকে তরুণদের সংগঠন সিজেপি নতুন করে মাঠে নামায় পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিচ্ছে। গত জুলাইয়ে তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করার দাবি তোলা সংগঠনটি এবার ভোটার তালিকার দাবিতে মাঠে অনড় রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে গভীর নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন