নভেম্বর ১, ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ১৩ কোটির বেশি নাগরিকের নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী নয়াদিল্লি। রোববার (১ নভেম্বর) বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ নেতাকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের সমন্বয়ে রাজধানীতে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বিক্ষোভকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) একতরফা রাজনৈতিক সুবিধা দিতেই কোটি কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কংগ্রেস নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে হাজারো মানুষ ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচির আওতায় কেন্দ্রীয় নয়াদিল্লি থেকে ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানের দিকে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যান। নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।
মিছিলের নিরাপত্তায় রামলীলা ময়দান ও আশপাশের এলাকায় লাঠি ও ঢাল হাতে শত শত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং প্রস্তুত রাখা হয় দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের সাঁজোয়া যান।
সমাবেশে অংশ নিয়ে রাহুল গান্ধী বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে পদ ছাড়তে হবে। তাকে অপসারণের মধ্য দিয়েই দেশকে সঠিক গণতান্ত্রিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভোটার তালিকা থেকে নাগরিকদের নাম ছেঁটে ফেলা প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের কণ্ঠস্বর চুরি করার শামিল। এটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহ ও জাতির সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
সমাবেশে অংশ নেওয়া কংগ্রেসের ছাত্রসংগঠনের কর্মী রীনা মাহতো জানান, ছত্তিশগড় রাজ্যের জগদলপুরে পৈতৃক ভিটায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করলেও ভুল তথ্যের অজুহাতে তার পরিবারের চার সদস্যের নাম অন্যত্র চলে গেছে দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে। তিনি এই চক্রান্তের বিচার ও জবাবদিহি দাবি করেন।
বাদ পড়া ১৩ কোটিরও বেশি ভোটারের সংখ্যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। বিরোধীদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় মূলত মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভোটারদের নিশানা করা হয়েছে, যারা সাধারণত বিজেপিকে সমর্থন করেন না।
তবে সব ধরনের দলীয় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে দ্বৈত নাগরিকত্ব বা একাধিকবার থাকা নাম এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দেওয়াই এই সংস্কারের একমাত্র লক্ষ্য ছিল। কোনো যোগ্য নাগরিকের নাম ভুলবশত বাদ পড়ে থাকলে তারা পুনরায় নিবন্ধনের আবেদন করতে পারবেন বলে আশ্বস্ত করেছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর কর্মকাণ্ডকে বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করে গণতন্ত্র দুর্বল করার অপচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে বিজেপি।
দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডা এ কর্মসূচিকে `সুপরিকল্পিত নাটক` অভিহিত করে বলেন, রামলীলা ময়দানে যা ঘটছে তা গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং দেশকে পরিকল্পিত নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেওয়ার এক গভীর ষড়যন্ত্র।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সাধারণ নাগরিক দিনেশ সিং উল্লেখ করেন যে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে নয়, বরং আগামী প্রজন্মের সাংবিধানিক ভোটাধিকার সুরক্ষিত রাখতেই তিনি সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভেবে রাজপথে শামিল হয়েছেন।
গত সেপ্টেম্বরের শেষভাগ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ করছে বিরোধী দলসমূহ, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং তরুণদের প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি। নির্বাচন কমিশনের দুই ডেপুটি কমিশনার ভোটার তালিকা সংশোধন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভ্যন্তরীণ নথিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন—এমন তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁসের পর থেকেই এই বিক্ষোভের সূচনা হয়।
বিশ্লেষকদের অভিমত, বিরোধী জোটের বাড়তে থাকা এই গণসমর্থন ও রাজপথের ধারাবাহিক আন্দোলন ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। যদিও দেশটির সরকার এখনো স্থিতিশীল রয়েছে এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৯ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন