শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬,

আবু সাঈদ ভেবেছিলেন সামনে মানুষ, তবে ‘তারা ছিল অমানুষ’

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

এপ্রিল ১০, ২০২৬, ০৯:৪২ এএম

আবু সাঈদ ভেবেছিলেন সামনে মানুষ, তবে ‘তারা ছিল অমানুষ’

সাঈদ হত্যার রায় ঘোষণা

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল বৃহস্পতিবার এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন, যেখানে দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। 

এ ছাড়া মামলার অন্য ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। দণ্ডিতদের তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, শিক্ষক, কর্মকর্তা, ছাত্রলীগ নেতা থেকে শুরু করে চিকিৎসক ও পুলিশ কর্মকর্তারা রয়েছেন। 

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় উল্লেখ করেন যে, আবু সাঈদ ভেবেছিলেন তার সামনে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা সেই সময় অমানুষ হয়ে গিয়েছিল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় পাঠ করেন। মামলার পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আবু সাঈদ যখন দুহাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে সামনের মানুষগুলো তাকে গুলি করবে না। কিন্তু তারা লক্ষ্যভিত্তিক ও পদ্ধতিগতভাবে তাকে হত্যা করার জন্য প্ররোচনা ও সহায়তা দিয়েছে। 

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা সরাসরি গুলি বর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন সাবেক সহকারী কমিশনার আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম নয়ন এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতিভূষণ রায় মাধব।

রায়ে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বেরোবির সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ, সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান, গণিত বিভাগের সাবেক শিক্ষক মশিউর রহমান, আসাদুজ্জামান মণ্ডল এবং ছাত্রলীগ নেতা পোমেল বড়ুয়াকে। ৫ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন সাবেক অতিরিক্ত উপকমিঞ্চার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী, উপকমিশনার আবু মারুফ হোসেন, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, মাসুদুল হাসান, অফিস সহকারী মাহাবুবার রহমান এবং ডা. সারোয়ার হোসেন। 

অন্যদিকে ৩ বছরের সাজা পেয়েছেন সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, ছাত্রলীগ নেতা মাহাফুজুর রহমান শামীম, ফজলে রাব্বী, আখতার হোসেন, সেজান আহম্মেদ, ধনঞ্জয় কুমার, বাবুল হোসেন, নুরুন্নবী মণ্ডল, একেএম আমির হোসেন এবং নূর আলম মিয়া।রায়ের পরপরই আদালত প্রাঙ্গণে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের এজলাস থেকে বের করে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় তারা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সাথে ধাক্কাধাক্কিতে লিপ্ত হন। 

এ সময় আসামিরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকেন যে তারা নির্দোষ এবং তাদের ফাঁসানো হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এএসআই আমির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি কেবল আদেশের গোলাম ছিলেন এবং তার সাথে অন্যায় করা হয়েছে। তবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এই রায়কে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। প্রসিকিউশন পক্ষ এই রায়ে আপাতত সন্তুষ্ট হলেও পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ঐতিহাসিক এই রায় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে শহীদ আবু সাঈদের পরিবার ও সহযোদ্ধাদের মধ্যে। রংপুরের পীরগঞ্জে নিজ বাড়িতে অবস্থান করা সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন এবং মা মনোয়ারা বেগম এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ছাত্রলীগ নেতা পোমেল বড়ুয়াসহ অন্যান্য যারা আবু সাঈদকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছিল, তাদেরও সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। সাঈদের ভাই রমজান আলী ও আবুল হোসেন জানান, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লঘু সাজা দেওয়া হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। 

সহযোদ্ধা শামসুর রহমান সুমনও সাজা কমানোর বিষয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন। বর্তমানে ৩০ আসামির মধ্যে মাত্র ৬ জন কারাবন্দি রয়েছেন এবং বাকি ২৪ জন পলাতক রয়েছেন। পরিবার ও সচেতন মহলের দাবি, পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে এই রায় কার্যকর করা হোক।