অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম
প্রতিদিন সকালে কর্কশ অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলেও শরীর যেন বিছানা ছাড়তেই চায় না। অথচ চারপাশে এমন অনেক মানুষ চোখে পড়ে, যাঁরা ঘড়ির কোনো সংকেত ছাড়াই প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে সতেজভাবে জেগে ওঠেন। এটি নিছক কোনো কাকতালীয় দীর্ঘদিনের অভ্যাস নয়, বরং এর পেছনে কাজ করে মানবদেহের সুনির্দিষ্ট এক অভ্যন্তরীণ শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য গবেষকদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন ও সময় মেনে ঘুমের শৃঙ্খলা তৈরি করতে পারলে কোনো কৃত্রিম অ্যালার্ম ছাড়াই প্রতিদিন সঠিক সময়ে জেগে ওঠা সম্ভব।
মানবদেহে সক্রিয় রয়েছে একটি প্রাকৃতিক জৈবঘড়ি, যা প্রাত্যহিক ঘুম ও জেগে ওঠার স্বাভাবিক চক্র বা ছন্দ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এই শারীরিক ছন্দ সুরক্ষিত রাখতে হলে একজন ব্যক্তিকে সবার আগে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ভোরে নির্দিষ্ট সময়ে বিছানা ছাড়ার কঠোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক পূর্ণাঙ্গ মানুষের শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে দৈনিক গড়ে সাত থেকে নয় ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি নিয়মিত ছয় ঘণ্টার কম ঘুমান, তবে তাঁর অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
জৈবঘড়ির সঠিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আলোর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের মতে, মানবদেহের অভ্যন্তরীণ সময়চক্রকে সচল রাখার প্রধান বাহ্যিক উপাদান হলো প্রাকৃতিক আলো। সকালের ভোরের রোদ চোখে লাগার সাথে সাথে মস্তিষ্ক জেগে ওঠার সরাসরি সংকেত পায়। অন্যদিকে, রাতের বেলা বিছানায় যাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে ঘরের প্রখর কৃত্রিম আলো কমিয়ে স্নিগ্ধ পরিবেশ তৈরি করলে শরীর প্রাকৃতিক নিয়মেই গভীর ঘুমের জন্য তৈরি হতে শুরু করে।
ঘুমের জন্য শোবার ঘরের পরিবেশের গুরুত্বও অপরিসীম। অপেক্ষাকৃত শীতল বা ঠান্ডা তাপমাত্রার ঘর গভীর ঘুমের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর পাশাপাশি রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মুঠোফোনে স্ক্রল করার ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে সরে আসা আবশ্যক। একটানা বিভিন্ন ডিজিটাল বার্তা ও দৃশ্য দেখতে গিয়ে মস্তিষ্ক অতিরিক্ত উত্তেজিত থাকে এবং অজান্তেই স্বাভাবিক ঘুমের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যায়।
খাবারের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন গবেষকরা। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে রাতের খাবার সম্পন্ন করা এবং ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের আহার শেষ করা শরীরের জন্য উত্তম। এর পাশাপাশি যেকোনো ধরনের অ্যালকোহল বা মাদক পরিহার করার স্পষ্ট পরামর্শ রয়েছে, কারণ এসব উপাদান স্নায়ুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে গভীর ঘুমের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চক্রকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
এই পদ্ধতির কার্যকারিতা নিজে পরখ করতে একজন গবেষক টানা সাত দিন কোনো অ্যালার্ম ব্যবহার না করে ভোরে ওঠার একটি ব্যবহারিক পরীক্ষা চালান।
তিনি নিরাপত্তার খাতিরে জরুরি প্রয়োজনে স্বাভাবিক ঘুম ভাঙার ২০ মিনিট পর একটি সতর্কতামূলক সংকেত প্রস্তুত রেখেছিলেন। প্রথম কয়েক রাতে এই ছন্দে কিছুটা ওঠানামা দেখা গেলেও চতুর্থ দিন থেকেই সকালে ঘুমঘুম ভাব ও ক্লান্তি লক্ষণীয়ভাবে দূর হতে শুরু করে। গবেষণার ফলাফলে স্পষ্ট হয় যে, প্রতিদিনের নির্দিষ্ট রুটিন রক্ষা এবং রাতে স্মার্টফোনের স্ক্রিন বন্ধ রাখাই শরীরকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনার মূল চাবিকাঠি।
ঘুম ও জেগে ওঠার সময়সূচি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গবেষকরা কোনো আকস্মিক পরিবর্তন না আনার পরামর্শ দিয়েছেন। সময় এগিয়ে আনতে চাইলে প্রতিদিন একবারে বড় পরিবর্তন না করে ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট করে রুটিন এগিয়ে নেওয়া উচিত। সবার শারীরিক গঠনের ছন্দ পুরোপুরি এক না হলেও নিয়মিত অনুশীলন ও পর্যাপ্ত বিশ্রামই শরীরকে সময়ের সংকেত বুঝতে সাহায্য করে, যার মাধ্যমে একদিন ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই নিজে থেকে চোখ খুলে যাবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন