অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত এক মেগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের আন্দোলন ঘিরে ভয়াবহ সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের অরুণাচলে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতার জেরে একটি সরকারি জলবিদ্যুৎ কার্যালয়, একটি পুলিশ থানা এবং পুলিশের সাত থেকে আটটি টহল গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। একই সাথে ক্ষমতাসীন দলের দুই স্থানীয় বিধায়ক এবং রাজ্য বিজেপি সভাপতির ব্যক্তিগত বাসভবনেও হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে উত্তেজিত জনতা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পূর্ব সিয়াং জেলার তিনটি প্রধান শহরে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি পাঁচজনের বেশি মানুষের একত্র হওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে যাওয়ায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা অনুযায়ী বিশেষ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) বিকেল ৫টা থেকে জেলার পাসিঘাট, মেবো ও রুকসিন—এই তিন পৌর এলাকায় কার্যকর হয় এই জরুরি প্রশাসনিক আদেশ।
পূর্ব সিয়াং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্পের বিরোধিতায় চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আরও বড় ধরনের রক্তক্ষয় ও সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এর আগে জেলা পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকেও সতর্কবার্তা দিয়ে জানানো হয় যে একদল আন্দোলনকারী সরকারি স্থাপনা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিকল্পিত হামলা চালাতে পারে। জেলা প্রশাসকের জারি করা আদেশে উল্লেখ করা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবন ও সার্বিক নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ায় জনশৃঙ্খলা ও সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে আগাম প্রশাসনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সংশ্লিষ্ট এলাকায় সব ধরনের জনসভা, বিক্ষোভ মিছিল, রাজনৈতিক জমায়েত এবং পাঁচজনের অধিক ব্যক্তির সমাবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
একই সাথে সাধারণ নাগরিকদের জন্য আগ্নেয়াস্ত্র, দা, তীর-ধনুক, বল্লম, ছুরি, কুঠার কিংবা লাঠিসহ যেকোনো ধরনের ধারালো ও প্রাণঘাতী অস্ত্র বহন সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সরকারি দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবেন। কোনো ব্যক্তি সম্পত্তি ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ কিংবা আইন অমান্য করার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার এই বিশালাকার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিরুদ্ধে গত শুক্রবার রাত থেকেই পাসিঘাটে নজিরবিহীন সহিংসতা শুরু হয়।
বিক্ষোভকারীরা ভারতীয় জাতীয় জলবিদ্যুৎ নিগম বা এনএইচপিসির স্থানীয় কার্যালয় ও একটি পূর্ণাঙ্গ থানায় পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এই মেগা প্রকল্পটি বর্তমানে প্রাথমিক ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশের গভীর আশঙ্কা, প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে তাদের হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হবেন। এছাড়া পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতিসাধনসহ আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি, পূর্বপুরুষদের জমি ও চিরায়ত জীবিকা চিরতরে বিলীন হওয়ার তীব্র উদ্বেগ রয়েছে তাদের মধ্যে।
অন্যদিকে রাজ্য সরকার দাবি করছে, তিব্বতের উজানে ইয়ারলুং সাংপো নদীতে চীনের নানা অবকাঠামো নির্মাণের প্রেক্ষাপটে পানির ন্যায্য ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থেই ভারতের এই প্রকল্পটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অরুণাচল প্রদেশে নদীটি সিয়াং নামে পরিচিত।
পূর্ব সিয়াংয়ের জেলা প্রশাসক জয়ন্তী পার্টিন জানান, শুক্রবার দিনের বেলায় পাসিঘাটে ডাকা সর্বাত্মক ধর্মঘট বা বন্ধ কর্মসূচি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু বিকেল ৫টায় ধর্মঘটের আনুষ্ঠানিক সময়সীমা শেষ হওয়ার পর হঠাৎ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েকশ ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারী জাতীয় মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেন এবং কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট ও নিরাপত্তা বাহিনীর অনুরোধ সত্ত্বেও পথ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।
টানা দুই ঘণ্টা সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর পুলিশ বাধ্য হয়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।
এর পরই উত্তেজিত জনতা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সরাসরি ব্যাপক পাথর ছুড়তে শুরু করে, যাতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। রাত ১১টার দিকে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং শুরু হয় উন্মত্ত অগ্নিসংযোগ ও তাণ্ডব, যা শনিবার ভোর পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলতে থাকে।
পাসিঘাটের ডেপুটি পুলিশ সুপার টনি তাতাক এই সংঘর্ষের মাঝে পড়ে ব্যক্তিগতভাবে আহত হন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে পাসিঘাটের হাই রিজিয়ন এলাকায় অবস্থিত এনএইচপিসির প্রশাসনিক দপ্তর ও সংলগ্ন পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশের অন্তত সাত থেকে আটটি গাড়ি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে।
সহিংসতার সময় পাসিঘাট পশ্চিমের বিধায়ক নিনং এরিং, মারিয়াং-গেকুর বিধায়ক ওনি পানিয়াং এবং অরুণাচল প্রদেশ বিজেপির সভাপতি কালিং ময়ংয়ের বাসভবনে তাণ্ডব চালানো হয়। এছাড়া স্থানীয় প্রধান আদিবাসী সংগঠন আদি বানে কেবাংয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও ভাঙচুর করা হয়েছে।
পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করায় শনিবার পুরো সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আন্দোলনকারীদের ধ্বংসাত্মক পথ পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এ ধরনের বিশৃঙ্খলা কোনো সমাধান আনতে পারে না; যাদের এই মেগা বাঁধ নিয়ে উদ্বেগ বা আপত্তি রয়েছে, তাদের ভাঙচুর না করে সরাসরি সরকারের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসা উচিত।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন