মে ১৪, ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম
বাংলাদেশের কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত কৃষি প্রকৌশল কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে কারিগরি পদগুলোতে দক্ষ জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য বা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো কৃষি খাতের জন্য আলাদা বিশেষায়িত অধিদপ্তর গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাজধানী ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) সদর দপ্তরে কৃষিকৌশল বিভাগ আয়োজিত এক সেমিনারে নীতিনির্ধারকেরা এই দাবি তুলে ধরেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, কৃষিকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হলে দক্ষ জনবল নিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পার হলেও কৃষি খাতে এখনো সমন্বয়হীনতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশেষ করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে এর সুফল পেতে দেরি হচ্ছে। এই সমস্যা দূর করতে একটি শক্তিশালী প্রকৌশল কাঠামো প্রয়োজন।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তাঁর বক্তব্যে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়াতে কারিগরি পদে অকারিগরি জনবল নিয়োগের প্রবণতা বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, সঠিক স্থানে সঠিক মানুষ নিয়োগ না করলে উন্নয়নের গতি ধীর হয়ে যায়। দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা কৃষি খাতের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই কৃষিবিদ ও প্রকৌশলীদের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে কৃষিকে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক ও লাভজনক করার দিকে নজর দিতে হবে।সেমিনারে উঠে আসা তথ্যানুযায়ী, উন্নত দেশগুলো বর্তমানে প্রায় ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালনা করছে। বাংলাদেশেও যান্ত্রিকীকরণের ছোঁয়া লাগলেও তা এখনো পূর্ণতা পায়নি।
আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, সময় সাশ্রয় এবং কৃষকের খরচ কমানো সম্ভব। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের কথা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, আগাম বন্যার হাত থেকে ফসল বাঁচাতে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি।কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফলে দেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। আগে যেখানে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান কাটতে ৪২ দিন সময় লাগত, আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারে তা এখন মাত্র ২৩ দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে বন্যার ঝুঁকি যেমন কমেছে, তেমনি কৃষকের শ্রম ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে।
সেমিনারে কৃষিতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়। সেচ ব্যবস্থাপনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা গেলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি নিশ্চিত হবে। এ সময় দেশের সব কৃষিযন্ত্রের ডিজিটাল নিবন্ধন ও অবস্থান শনাক্তকরণের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা সহজ হবে।বক্তারা আরও বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃষিকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর জাতীয় উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করতে হবে। সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার অপচয় রোধে আধুনিক সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন।
এ ছাড়া বোরো ধান কাটার সময় ১৫ এপ্রিলের আগে শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক সহায়তা ও শ্রম ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।সবশেষে আইইবি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করেন, সেমিনারে উত্থাপিত এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে কৃষি খাত আরও দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হয়ে উঠবে। কৃষি প্রকৌশলীদের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি এবং একটি বিশেষায়িত অধিদপ্তর গঠন করা গেলে কৃষি খাতের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে। দক্ষ জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনেই কৃষি বিপ্লবকে টেকসই করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন