বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৬,
উন্নয়ন ব্যয়ে শৃঙ্খলা

সরকারি প্রকল্পে ওভারল্যাপিং বন্ধের নির্দেশ শিল্পমন্ত্রীর

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ১, ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম

সরকারি প্রকল্পে ওভারল্যাপিং বন্ধের নির্দেশ শিল্পমন্ত্রীর

দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যকার ওভারল্যাপিং বা একই ধরনের কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির অধীনে নতুন যেকোনো প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য ও কর্মপরিধির সাথে কোনো ধরনের দ্বৈততা রয়েছে কি না, তা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে যাচাই করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) শিল্প মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত ‍‍`বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি: চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়‍‍` শীর্ষক এক জাতীয় গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এই নির্দেশনা তুলে ধরেন। যৌথভাবে এই বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ন্যাশনাল প্রোডাকটিভিটি অর্গানাইজেশন বা এনপিও এবং দৈনিক যুগান্তর। শিল্পমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে এনএসডি মূলত একটি নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটরি বিষয়, অন্যদিকে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত কৌশল। এই দুটি পৃথক ধারণাকে এক করে দেখলে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঠিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে যদি একই ধরনের কার্যক্রম সমান্তরালভাবে চলতে থাকে, তবে জাতীয় বাজেটের কাঙ্ক্ষিত সুফল চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এডিপির আওতায় নতুন প্রকল্প প্রস্তাবগুলো আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাইয়ের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন মন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, নতুন প্রস্তাব পাওয়ার সাথে সাথে বিশেষায়িত সফটওয়্যার ব্যবহার করে একই উদ্দেশ্যে অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা সংস্থায় প্রকল্প চলমান রয়েছে কি না, তা আগাম শনাক্ত করা সম্ভব হলে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং অপচয় বহুলাংশে কমবে। সরকারি উদ্যোগে দ্বৈততা বা ওভারল্যাপিং হ্রাস করা গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যমান কাঠামোগত অদক্ষতার একটি বড় অংশের কার্যকর সমাধান মিলবে। আন্তর্জাতিক বাজারের কঠোর বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অনিবার্যতা কেবল বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়, বরং প্রতিটি বাণিজ্যিক অর্থনীতির জন্যই একটি প্রধান শর্ত। কোনো পণ্য যদি স্থানীয়ভাবে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ও মানে উৎপাদন করা না যায়, তবে বৈশ্বিক বাজারে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ দ্রুত সেই বাণিজ্যিক স্থান দখল করে নেবে।

কেবল কৃত্রিমভাবে অভ্যন্তরীণ বাজার সুরক্ষার নীতিতে দীর্ঘকাল টিকে থাকা অসম্ভব। নির্দিষ্ট সময়সীমার ভেতরে দেশীয় প্রতিটি শিল্প খাতকে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জন করতে হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সমকালীন বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের যে গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সংযুক্তি তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে কোনোভাবেই হঠাৎ করে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। উন্মুক্ত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই যুগে জাতীয় শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব টিকিয়ে রাখতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। উৎপাদনশীলতাকে কেবল কলকারখানার উৎপাদন বৃদ্ধির বৃত্তে আটকে না রেখে একে একটি সামগ্রিক জাতীয় সংস্কৃতিতে রূপান্তরের আহ্বান জানান তিনি।

কম শারীরিক শ্রম ও পরিমিত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে অধিক পরিমাণ উন্নতমানের পণ্য নিশ্চিত করাই এই ধারণার মূল ভিত্তি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে আধুনিক প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক উপকরণের সর্বোত্তম প্রয়োগ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা প্রসারিত করেছে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্প খাত দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেছে যে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তি ব্যবহারের মানসিকতা ও বাস্তব কাজের দক্ষতা থাকলে সাধারণ শ্রমিকরাও উল্লেখযোগ্যভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারেন। আমাদের মূল সমস্যা কেবল প্রায়োগিক দক্ষতার অভাব নয়। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরদূরদর্শী নেতৃত্ব, সঠিক কৌশলগত পরিকল্পনা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সংকল্পের ঘাটতিই উৎপাদনশীলতা অগ্রযাত্রার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। তিনি দেশের শিল্প খাতকে শক্তিশালী করতে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন।

অনুষ্ঠানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদার, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. ফজলুল হক এবং এনপিওর মহাপরিচালক মোহা. নায়েব আলীসহ শীর্ষস্থানীয় গবেষক, শিল্পোদ্যোক্তা ও নীতি-নির্ধারকরা আলোচনায় অংশ নেন।