শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬,
সাংবিধানিক সংকট ও সংস্কার

সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলকে আসার আহ্বান জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম

সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলকে আসার আহ্বান জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সংস্কারের দাবি রাজপথের লংমার্চ করে সমাধান করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আসার আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক ধারাবাহিক সেমিনারের ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি স্পষ্ট করে জানান, আলোচনা চালিয়ে নিতে হলে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে প্রক্রিয়ার অংশ হতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মতভিন্নতার কারণে আগে যে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর শর্ত শিথিল বা সমন্বয় করতে হলেও আনুষ্ঠানিক সংলাপে বসতে হবে। এসব মৌলিক সংকট রাজপথে লংমার্চ করে মেটানো সম্ভব নয়, বরং আলোচনার টেবিলেই সমাধানে পৌঁছাতে হবে।

সেমিনারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তৈরি হওয়া ‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই জাতীয় সনদের হয়তো সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি ভিত্তি নেই, তবে এর রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্ব যেকোনো লিখিত আইনি ভিত্তির চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর। যখন প্রশ্ন উঠেছিল দেশের মানুষ এই সনদ চায় কি না এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের শেষ দিকে এর আইনি স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তখনই এটিকে একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

দেশে ভবিষ্যতে যাতে আর কখনোই এ ধরনের জুলাই স্মৃতি জাদুঘর তৈরির মতো শোকাবহ পরিবেশ না আসে, সে ব্যাপারে সাংবিধানিক সুরক্ষার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই সাংবিধানিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য। গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন এবং বিশ্বাসযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষা এবং তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ধারণ করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। ঐকমত্য ও সমঝোতার ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংশোধনী আনা গেলে তা জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তি বা স্বৈরশাসক মাথাচাড়া দিতে না পারে, সেই পথগুলো আইনিভাবে চিরতরে রুদ্ধ করাই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, সংবিধানে উচ্চকক্ষ গঠন করা হলে তা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে করা উচিত। তিনি প্রস্তাব করেন, উচ্চ পরিষদের সদস্যদের জন্য কোনো ধরনের বেতন, ভাতা বা গাড়ি-বাড়ির সুবিধা রাখা যাবে না, যাতে প্রকৃত সৎ ব্যক্তিরা কোনো সুযোগ-সুবিধার লোভ ছাড়া কেবল দেশসেবার মানসিকতা নিয়ে এতে অংশ নেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে সরকারের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন ড. আসিফ নজরুল।

তিনি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর প্রধান পদ বিরোধী দলকে দেওয়া এবং সেসব কমিটিকে যেকোনো রাষ্ট্রীয় নথি বা ব্যক্তিকে তলব করার আইনি ক্ষমতা প্রদানের দাবি জানান। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে অনতিবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ আইন প্রণয়ন, প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন এবং নিম্ন আদালতের অভিজ্ঞ বিচারকদের জন্য ৫০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের তাগিদ দেন তিনি। এছাড়া ধাপে ধাপে নিম্ন আদালতের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে ন্যস্ত করতে নির্দিষ্ট পর্যালোচনা ধারা যুক্ত করার পরামর্শ দেন। তিনি সতর্ক করেন, এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন না করলে জাতি হিসেবে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া হবে।

বাকশাল ও চতুর্থ সংশোধনীকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে ড. আসিফ নজরুল বলেন, এর মাধ্যমে মূলত এক দলের নয়, এক ব্যক্তির সর্বময় শাসন কায়েম করা হয়েছিল।

এতে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দেওয়া, সদস্যদের বন্দি করা কিংবা যখন-তখন বিচারকদের অপসারণের মতো একচ্ছত্র ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার ঘটনাকে প্রাচীন যুগের রাজতন্ত্রের সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, চতুর্থ সংশোধনী ছিল বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ঘটনা, যা প্রকারান্তরে সংবিধানের কবর রচনা করেছিল। উচ্চ আদালত পঞ্চম বা সপ্তম সংশোধনী নিয়ে আলোচনা করলেও চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে নীরব থেকেছে, অথচ এটি চালু না হলে দেশে পরবর্তী সামরিক শাসনের পটভূমি তৈরি হতো না।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান।