রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে কতটা নিরাপদ আমাদের মাতৃভাষা?

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে কতটা নিরাপদ আমাদের মাতৃভাষা?

বিপন্ন ভাষার আর্তনাদ

উনিশশ বায়ান্ন সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার রাজপথে যখন রক্ত ঝরেছিল, তখন একুশের অমর গানের সেই কালজয়ী পঙ্‌ক্তি ছিল একটি নির্দিষ্ট ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির অদম্য প্রতিবাদ। তবে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছি, তখন এই পঙ্‌ক্তিটি আর কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নেই। 

এটি আজ বিশ্বের হাজারো বিপন্ন ভাষা-সম্প্রদায়ের এক গভীর বৈশ্বিক আর্তনাদে পরিণত হয়েছে। আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্যের আড়ালে প্রতিদিন একটি করে ভাষার মৃত্যু ঘটছে আমাজন থেকে আর্কটিক কিংবা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী পাড়াগুলোয়। যা মূলত মানবজাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষতি।

ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। বিশ্বে প্রচলিত প্রায় সাত হাজার ভাষার মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ আজ বিলুপ্তির পথে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে একটি ভাষা। 

একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল কতগুলো ধ্বনি বা বর্ণের মৃত্যু নয়; বরং এটি একটি পুরো বিশ্বদর্শন, প্রথাগত পরিবেশগত জ্ঞান এবং একটি জাতির হাজার বছরের শিকড়ের বিনাশ। যখন একটি ভাষা মরে যায়, তখন তার সঙ্গে হারিয়ে যায় প্রাচীন ঔষধি গাছের নাম, প্রকৃতির পূর্বাভাস জানার কৌশল কিংবা পূর্বপুরুষের মুখ থেকে শোনা অনন্য সব লোকগাথা ও সৃষ্টিতত্ত্ব।ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভাষা কেড়ে নেওয়ার এই প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত পদ্ধতিগত ও নিষ্ঠুর ছিল। 

উত্তর আমেরিকার ইন্ডিয়ান বোর্ডিং স্কুল থেকে শুরু করে কানাডার রেসিডেন্সিয়াল স্কুল—সবখানেই লক্ষ্য ছিল অভিন্ন। শিশুদের তাদের মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি আধিপত্যশীল সংস্কৃতি ও ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের প্রায় ২০৫টি ভাষার অধিকাংশই আজ মৃতপ্রায় কেবল দীর্ঘদিনের কলোনিয়াল পলিসির কারণে। বর্তমানে শুধু রাষ্ট্রীয় নীতি নয়, জলবায়ু পরিবর্তনও ভাষার জন্য যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন আর্কটিকের বরফ গলে যাওয়ায় ইনুইট সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে এবং তাদের ভাষার বিশেষ শব্দভাণ্ডারও দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।

এশিয়া অঞ্চলেও এই ভাষিক বিপর্যয় স্পষ্ট। ভারতে প্রায় ২০০টি ভাষা বিপন্ন তালিকায় রয়েছে, যার মধ্যে ওড়িশার গাদাবা বা আন্দামানি ভাষাগুলো প্রায় বিলুপ্ত। জাপানের আইনু ভাষা একসময় নিষিদ্ধ থাকায় তা এখন কেবল গুটিকতক বৃদ্ধের স্মৃতিতে টিকে আছে। লাতিন আমেরিকায় স্প্যানিশ ও পর্তুগিজের আধিপত্যে কেচুয়া বা আইমারা ভাষাগুলো সংকুচিত হচ্ছে। এই ভাষিক আগ্রাসনের মূলে রয়েছে জোরপূর্বক একীভূতকরণ নীতি এবং বিশ্বজুড়ে ইংরেজি বা ম্যান্ডারিনের মতো শক্তিশালী ভাষার একচেটিয়া প্রভাব। আধুনিক বিশ্বায়ন ‘ভাষিক লজ্জা’ তৈরির মাধ্যমে শিশুদের তাদের মায়ের ভাষা থেকে বিচ্যুত করছে, যা বৈচিত্র্যের সৌন্দর্যকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

তবে এই সংকটের মাঝেও কিছু আশার আলো দেখা যাচ্ছে। নিউজিল্যান্ডে মাওরি ভাষার পুনর্জাগরণ কিংবা মরক্কোয় তামাজাইট ভাষাকে দাপ্তরিক স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনাগুলো ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। প্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে ওয়েলশ ভাষা যেভাবে ফিরে এসেছে, তা থেকে বিশ্ব শিক্ষা নিতে পারে। জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী ভাষা দশক একটি সুযোগ তৈরি করেছে সত্য, কিন্তু যথাযথ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কেবল দিবস পালন করে ভাষাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থায় বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা এবং মাতৃভাষার চর্চাকে উৎসাহিত করা এখন সময়ের দাবি।

একুশের এই মাসে আমাদের কেবল নিজের ভাষা রক্ষা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আমাদের বুঝতে হবে যে, ভাষা কেড়ে নেওয়া মানে একটি মানুষের আত্মাকে পঙ্গু করে দেওয়া। একুশের চেতনা যেন কেবল শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং বিশ্বের প্রতিটি কোনায় মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। কারণ বৈচিত্র্যহীন একভাষী পৃথিবী হবে একটি ধূসর মরুভূমির মতো। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষা যেন তার নিজস্ব মহিমায় বেঁচে থাকতে পারে, তবেই মানুষ তার আপন পরিচয়ে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।