রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

জেদ আর পরিশ্রমে কিংবদন্তি রোনালদো: দারিদ্র থেকে বিশ্বসেরা হওয়ার গল্প

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৭, ২০২৫, ১১:০০ এএম

জেদ আর পরিশ্রমে কিংবদন্তি রোনালদো: দারিদ্র থেকে বিশ্বসেরা হওয়ার গল্প

ছবি- সংগৃহীত

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের এক অমর নাম, যিনি দারিদ্র্য, সমালোচনা এবং অসংখ্য ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নিজের অদম্য জেদ ও কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে কিংবদন্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পৃথিবীতে দু'ধরনের মানুষ আছে; একদল সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকে, আর আরেকদল সুযোগ না থাকলেও নিজেদের জেদ দিয়ে তা তৈরি করে নেয়, রোনালদো ছিলেন দ্বিতীয় দলের একজন।

তার কাছে নিজের জেদ ছিল লাইফলাইনের মতো, যেখানে থামলেই সব শেষ। তার জন্ম হয়েছিল এক দরিদ্র পরিবারে, বাবা ছিলেন স্থানীয় ক্লাবের কিট ম্যানেজার আর মা ছিলেন রান্নার দায়িত্বে থাকা গৃহিণী। চার ভাইবোনের মধ্যে রোনালদো ছিলেন সবার ছোট এবং পরিবারটি এতটাই দরিদ্র ছিল যে তার মা গর্ভবতী হওয়ার সময় তাকে জন্ম দিতে চাননি, কারণ তিনি আরও একটি সন্তানের খরচ চালাতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ ছিল।

তাদের পরিবার একটি মাত্র রুমে গাদাগাদি করে থাকতো, অনেক সময় পর্যাপ্ত খাবারও জুটতো না, আর বাবা মদ্যপানে আসক্ত ছিলেন। ছোটবেলায় ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা এতটাই তীব্র ছিল যে অনেক সময় ঠিকমতো খাবার না পেলেও ক্ষুধার্থ অবস্থায় মাঠে দৌড়াতেন।

রোনালদো একবার বলেছিলেন, তিনি ছোটবেলায় সহপাঠীদের কাছে খাবার চেয়ে খেতেন এবং ম্যাকডোনাল্ডসে গিয়ে ঝুটাবার্গারও চেয়ে খেয়েছিলেন। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি আন্দরিনা ক্লাবে যোগ দেন এবং তার প্রতিভা দেখে কোচেরা মুগ্ধ হন।

কিন্তু শারীরিক গঠনের সমস্যা ছিল, তিনি ছিলেন খুবই রোগাপাতলা, তাই তাকে শরীর গঠনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। এরপর ১২ বছর বয়সে তিনি স্পোর্টিং লিসবনের যুব একাডেমিতে সুযোগ পান, যার জন্য তাকে পরিবার ছাড়তে হয়।

লিসবনের মানুষের ভাষা ও জীবনযাপন তার জন্য নতুন ছিল এবং অনেকেই তার কথা বলা নিয়ে মজা করতো। ১৪ বছর বয়সে তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, কারণ তিনি রাগের বশে শিক্ষককে চেয়ার ছুঁড়ে মেরেছিলেন। তবে এগুলো কিছুই তার মনোবলে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি, বরং দিনে দিনে তিনি নিজেকে কঠিনভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিলেন। ১৬ বছর বয়সে স্পোর্টিং লিসবনের সিনিয়র দলে তার অভিষেক হয়।

তার গতি, ডিবলিং এবং গোল করার ক্ষমতা দেখে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন মুগ্ধ হন এবং তাকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০০৩ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে রোনালদো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেন এবং সেখান থেকেই শুরু হয় তার উত্থান। কিন্তু মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি বাবাকে লিভারের সমস্যার কারণে হারিয়ে ফেলেন, যা তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ। রোনালদো কখনোই শুধুমাত্র তার প্রতিভার ওপর নির্ভর করেননি, কারণ তিনি জানতেন প্রকৃত সাফল্য আসে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। যখন অন্যরা বিশ্রাম নিত, তখনও রোনালদো মাঠে ঘাম ঝরাতেন।

প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা অনুশীলন, ফিটনেস, স্ট্যামিনা ও স্কিল ডেভেলপ করার জন্য বিশেষ ট্রেনিং তার রুটিনের অংশ ছিল। তরুণ বয়সে তিনি প্রতিদিন প্রায় ৩০০০ সিট-আপ করতেন। রিয়াল মাদ্রিদে থাকার সময় তার সতীর্থরা বলতো, রাত দু'টার সময়ও প্র্যাকটিসে গেলে রোনালদোকে আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত দেখা যেতো। তার শরীরে মাত্র ১১ শতাংশ ফ্যাট আছে এবং তিনি প্রতি ঘন্টায় প্রায় ৩৪ কিলোমিটার গতিতে দৌড়াতে পারেন, যা তাকে বিশ্বের দ্রুততম ফুটবলারদের একজন বানিয়েছে। তার লাফ দেওয়ার ক্ষমতা ৭৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত, যা অনেক পেশাদার বাস্কেটবল খেলোয়াড়দেরও নেই।

ইউরো ২০১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে পর্তুগাল বনাম ফ্রান্স ম্যাচে ১৭তম মিনিটে ইনজুরিতে পড়ে ২৫তম মিনিটে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়লেও, তিনি সাইড লাইনে দাঁড়িয়ে কোচের মতো দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১০৯তম মিনিটে পর্তুগাল গোল করলে খেলার শেষে রোনালদো বলেছিলেন, "শুরুতে আমি কেঁদেছিলাম দুঃখে আর পরে কেঁদেছি আনন্দে, কারণ আমরা ইতিহাস গড়েছি"। তার ব্যক্তিগত রেকর্ডের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি ব্যালন ডি'অর, চারটি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট, ক্যারিয়ারে ৮৫০টির বেশি গোল এবং ৪০টিরও বেশি হ্যাট্রিক।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড হয়ে তিনবার, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দুবার লা লিগা শিরোপা এবং জুভেন্টাসের হয়ে দুবার সেরি আ চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। পর্তুগালের হয়ে তিনি একটি ইউরো কাপ এবং একটি নেশনস লীগ জিতেছেন। তিনি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও হ্যাট্রিকের মালিক এবং জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ডও তার দখলে। রোনালদো প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পত্তির মালিক, যা তাকে ইতিহাসের প্রথম বিলিয়নিয়ার ফুটবলার বানিয়েছে।

তার বার্ষিক পারিশ্রমিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার, এবং নাইকি, কোকাকোলা, ক্যাস্ট্রোলের মতো ব্র্যান্ড থেকে বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেন। তার নিজস্ব ফ্যাশন ব্র্যান্ড সিআর সেভেন এবং হোটেল চেন পেস্তানা সিআর সেভেনও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ৬০০ মিলিয়নের বেশি ফলোয়ার রয়েছে এবং প্রতিটি স্পন্সর পোস্ট থেকে তিনি ২ থেকে ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেন।

তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিভা কম থাকলেও কঠোর পরিশ্রম করলে সবকিছু অর্জন করা সম্ভব। তাই যখনই মনে হয় ক্লান্ত কিংবা হাল ছেড়ে দিতে চান, রোনালদোর জীবনের এই গল্পটা মনে করে নিতে হবে।