ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামা উপজেলায় অবস্থিত সুখিয়া ভ্যালি বর্তমানে দেশের উদীয়মান পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই স্থানটি পাহাড় এবং নদীর এক অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখান থেকে সকালের স্নিগ্ধ সূর্যোদয় এবং বিকেলের মায়াবী সূর্যাস্ত পর্যটকদের দারুণভাবে বিমোটহিত করে।
ভ্যালির চারপাশ জুড়ে থাকা সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা মাতামুহুরী নদীর সর্পিল গতিপথ এই জনপদের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যারা যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে যেতে চান, তাদের জন্য সুখিয়া ভ্যালি একটি আদর্শ গন্তব্য হতে পারে।
এই ভ্যালির প্রধান আকর্ষণ হলো পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার। এই টাওয়ারে দাঁড়ালে একদিকে মাতামুহুরী নদী এবং অন্যদিকে সুখিয়া ও দুখিয়া পাহাড়ের বিশালতা চোখে পড়ে। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকদের জন্য এখানে হিল হাইকিং এবং ট্র্যাকিংয়ের সুব্যবস্থা রয়েছে।
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে ওঠার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এখানে তাবু খাটিয়ে ক্যাম্পিং করার সুযোগ অনেককেই আকৃষ্ট করছে। এছাড়া যারা নদীপথে ভ্রমণ পছন্দ করেন, তারা মাতামুহুরী নদী থেকে নৌকা ভাড়া করে সাদা পাহাড়, মিনঝিরি পাড়া এবং দুখিয়া পাহাড়ের মতো আকর্ষণীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখতে পারেন। লামার জনপ্রিয় মিরিঞ্জা ভ্যালির সাথে এর তুলনা চললেও এর শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ একে অনন্য করে তুলেছে।
সুখিয়া ভ্যালিতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি পর্যটকদের জন্য বেশ সহজ ও সাবলীল। রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি আলীকদমের বাসে করে লামা আসা যায়। এছাড়া কক্সবাজারগামী বাসে চকরিয়া নেমে সেখান থেকে জীপ, চান্দের গাড়ি বা সিএনজি অটোরিকশায় করে লামা বাস টার্মিনাল পৌঁছানো সম্ভব। ঢাকা থেকে চকরিয়া পর্যন্ত এসি বা নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৮৬০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। চকরিয়া থেকে লামা যাওয়ার জন্য জনপ্রতি ভাড়া পড়ে ৭০ থেকে ১০০ টাকা।
এরপর লামা বাস টার্মিনাল থেকে খুব সহজেই অটোতে করে মাত্র ৩০ টাকা ভাড়ায় সরাসরি সুখিয়া ভ্যালিতে পৌঁছানো যায়। চট্টগ্রাম থেকে যারা আসতে চান, তারা নতুন ব্রিজ বাস স্ট্যান্ড থেকে চকরিয়া হয়ে একই পথে আসতে পারেন।পর্যটকদের থাকার জন্য সুখিয়া ভ্যালিতে বর্তমানে বেশ কিছু ইকো-রিসোর্ট ও জুম ঘর গড়ে উঠেছে। স্থানীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় তৈরি এই জুম ঘরগুলোতে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে ৬ থেকে ১০ জন পর্যন্ত অনায়াসে থাকতে পারেন।
যারা কিছুটা আরামদায়ক ও প্রিমিয়াম রুম খুঁজছেন, তাদের জন্য ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচে ভালো মানের কটেজ রয়েছে। এছাড়া অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের জন্য মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় তাবুতে রাত কাটানোর সুযোগও রয়েছে। খাবারের ক্ষেত্রে এই ভ্যালির রিসোর্টগুলোতে প্যাকেজ সিস্টেম চালু রয়েছে। সাধারণত ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকার প্যাকেজে সকালের নাস্তা, দুপুর ও রাতের খাবার অন্তর্ভুক্ত থাকে। পাহাড়ি মুরগি, জুমের সবজি এবং রাতে বারবিকিউর আয়োজন ভ্রমণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
ভ্রমণের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ও প্রশাসনিক বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। লামা বাজারে সেনাবাহিনী চেকপোস্ট থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যটকদের অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে রাখতে হবে। পাহাড়ি পথে হাঁটার জন্য ভালো গ্রিপের জুতা এবং নদী ভ্রমণের জন্য লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করা নিরাপদ। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য রক্ষায় পর্যটকদের সচেতন হতে হবে এবং কোনোভাবেই যেন প্লাস্টিক বা আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নোংরা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। স্থানীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি। পরিকল্পিত ও দায়িত্বশীল পর্যটনই পারে আমাদের পাহাড়ের এই অপার সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন