মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

সমন্বিত কৃষি খামার: বছরে চারবার মাছ ধরে সাফল্য

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১১:৩৯ এএম

সমন্বিত কৃষি খামার: বছরে চারবার মাছ ধরে সাফল্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গনির মোড় এলাকায় সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে পাঁচ বছর ধরে নিরাপদ মাছ ও ফলমূল উৎপাদনে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন স্থানীয় উদ্যোক্তা বাবু। ১৫ বছরের মৎস্য চাষের অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে তিনি একই পুকুর থেকে বছরে চার ধাপে মাছ আহরণ করে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় ফলন প্রায় দ্বিগুণে উন্নীত করেছেন।

সমন্বিত এই প্রকল্পে রয়েছে পাঁচটি পুকুর।

মাছ দ্রুত মোটাতাজাকরণ বা কার্প ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে তিনি এক বছরের বেশি বয়সী পোনা মজুত করেন। এতে প্রতি বিঘায় ২৫০টি রুই, ৭০টি কাতল, ১০০টি মৃগেল এবং ২৫টি সিলভার কার্প ছাড়া হয়। পোনা ছাড়ার সময় রুই ও মৃগেল ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম, কাতল এক কেজির বেশি এবং সিলভার কার্প ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের থাকে। মজুতের প্রায় ১৫০ দিন বা পাঁচ মাস পর প্রথমবারের মতো মোট মাছের ২৫ শতাংশ বা ৬০ থেকে ৬৫টি মাছ ধরে বিক্রি করা হয়। এতে পুকুরে স্থান ফাঁকা হওয়ায় বাকি মাছ দ্রুত বাড়ার সুযোগ পায় এবং পরবর্তী প্রতি ৪৫ দিন অন্তর বাকি মাছ তিন ধাপে আহরণ করা হয়। শেষ দুটি ধাপে রুই মাছের ওজন চার থেকে পাঁচ কেজি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। গতানুগতিক পদ্ধতিতে প্রতি বিঘায় বছরে ২০ থেকে ২৫ মণ মাছ উৎপাদন হলেও এই নতুন পর্যায়ক্রমিক আহরণ কৌশলে ফলন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ মণে।

মাছকে নিয়মিত নিরাপদ নিজস্ব তৈরি খাবার সরবরাহ করার পাশাপাশি পানির পরিবেশ ঠিক রাখতে প্রতি ১৫ দিন পর পর অ্যামোনিয়া ও পিএইচ পরীক্ষা করা হয়। মাছের মল ও বর্জ্য পুকুরে জমা হয়ে যেন পানির গুণমান নষ্ট না করে, সে জন্য খামারে নিয়মিত প্রোবায়োটিক বা উপকারী ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করা হয়। এই ব্যাকটেরিয়া তলার বর্জ্য শোষণ করে তা পুনরায় প্রাকৃতিক খাবারে রূপান্তর করে। পুরো প্রকল্পে চারজন সার্বক্ষণিক কর্মী মাসিক বেতনে কাজ করছেন এবং মাছ ধরার সময় দৈনিক ভিত্তিতে জেলেদের যুক্ত করা হয়। লিজ নেওয়া এই নিচু পতিত জমিতে আগে বছরে মাত্র একবার ধান আবাদ হতো এবং বর্ষায় তা তলিয়ে যেত। সেখানেই তিনি প্রশস্ত পাড় তৈরি করে পুকুর খনন করেছেন। পুকুরের পাড়ে পাতা ঝরে যেন পানি নষ্ট না হয়, সেজন্য আমগাছের বদলে চার হাজার ঐতিহ্যবাহী চিনি চম্পা বা চিনি কলার গাছ লাগিয়েছেন। এর পাশাপাশি সেখানে রয়েছে ৮০০টি নাবি জাতের আমগাছ এবং বেশ কিছু মাল্টা ও কমলার গাছ। কলার ভালো ফলন নিশ্চিত করতে চারা রোপণের আগে মাটিতে নিমখোল প্রয়োগ করা হয় এবং প্রধান গাছের খাদ্য নিশ্চিত করতে পাশের অনাকাঙ্ক্ষিত নতুন চারাগুলো নিয়মিত কেটে ফেলা হয়। কলা পরিপক্ব হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে একটি মাত্র চারা বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

উৎপাদিত চিনি কলা স্থানীয় পাইকারদের মাধ্যমে সরাসরি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বিক্রি হয়। ভবিষ্যতে গাছের সংখ্যা চার হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং নিজস্ব বাগান থেকেই এর চারা সংগ্রহ করা হবে। পুরো কৃষি কার্যক্রমে তিনি স্থানীয় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে পরিচর্যা পরিচালনা করছেন। খামারের প্রধান সংকট বিদ্যুৎ সংযোগের বাণিজ্যিক শ্রেণিভুক্তকরণ। কৃষিকাজে ব্যবহৃত হওয়ায় তিনি সেচ ও যন্ত্রপাতির জন্য বাণিজ্যিক ইউনিটের বদলে সাশ্রয়ী কৃষি ইউনিটের বিদ্যুৎ সুবিধা দাবি করেছেন এবং এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তরের সহায়তা চেয়েছেন।

ভবিষ্যতে খামারের পরিধি আরও বিস্তৃত করে ২০০ গরুর একটি দুগ্ধ ও মাংসের খামার গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন এই চাষি। একই সাথে সাধারণ দিনমজুর ও রিকশাচালকদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করতে ১০০ টাকার মধ্যে পাঁচ থেকে ছয় টুকরো প্যাকেটজাত নিরাপদ প্রক্রিয়াজাত মাছ ও মাংস বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে এই স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে চান তিনি।