বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

আজ ইয়াসমিন হত্যা দিবস দিনাজপুরের সেই রক্তাক্ত দিন

মো: মামুনুর রশিদ

আগস্ট ২৪, ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম

আজ ইয়াসমিন হত্যা দিবস দিনাজপুরের সেই রক্তাক্ত দিন

ছবি: দিনাজপুর টিভি নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ চব্বিশ আগস্ট ইয়াসমিন হত্যা দিবস। উনিশশো পঁচান্ন সালের চব্বিশ আগস্ট দিনাজপুরের ইতিহাসে একটি বেদনাবিধুর ও রক্তাক্ত দিন। পুলিশের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার কিশোরী ইয়াসমিন আক্তারের মৃত্যুর প্রতিবাদে সেদিন উত্তাল হয়ে উঠেছিল পুরো জেলা। এক ইয়াসমিনের হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন আরও সাতজন। সেই ঘটনার একত্রিশ বছর পরও দিনাজপুরবাসীর স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে ইয়াসমিনের নাম। 

উনিশশো পঁচান্ন সালের তেইশ আগস্ট দিবাগত রাতে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা একটি বাসে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে নামেন আনুমানিক ষোলো বছর বয়সী ইয়াসমিন আক্তার। তিনি ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। রাতে একা অবস্থান করায় স্থানীয় কয়েকজন তাকে পুলিশের টহল ভ্যানে করে দিনাজপুর শহরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ভ্যানে থাকা একজন এএসআই ও দুই কনস্টেবলও তাকে নিরাপত্তার কথা বলে গাড়িতে ওঠার জন্য বলেন। 

প্রথমে অনিচ্ছুক থাকলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশের ভ্যানে ওঠেন কিশোরী ইয়াসমিন। পরদিন সকালে দিনাজপুরের গোবিন্দপুর এলাকায় ইয়াসমিনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিনাজপুর। বিক্ষুব্ধ জনতা বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। দিনাজপুর শহরের কাস্টমস গুদামে লুটপাটের পর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়েও হামলার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরে তৎকালীন বিডিআর মোতায়েন করা হয় এবং জারি করা হয় কারফিউ। 

তবে কারফিউ উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ঘটনার দুদিন পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কোতোয়ালি থানা ঘেরাও করে সারারাত অবরুদ্ধ করে রাখে। পরদিন শহরের বিভিন্ন স্থানে শত শত মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি চালালে সাতজন নিহত হন। ইয়াসমিনের গায়েবানা জানাজায় অংশ নেন হাজারো মানুষ। ইয়াসমিন হত্যাকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, অনেক পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার কারণে আত্মগোপনে চলে যান। 

তৎকালীন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে দিনাজপুর শহরের এমন পরিস্থিতির চিত্র উঠে আসে, যেখানে পুলিশকে বাড়ি ভাড়া দিতেও অনীহা প্রকাশ করেছিলেন স্থানীয়রা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিডিআরের পাহারায় দিনাজপুর শহরে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে দিনাজপুরের পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়। একই সঙ্গে জেলার একশো পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যকে অন্যত্র বদলি করা হয়। তবে সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারিত এক প্রেসনোটে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের দায়মুক্ত করার চেষ্টা এবং ঘটনার দায় ইয়াসমিনের ওপর চাপানোর অভিযোগ ওঠে। এতে ক্ষোভ আরও বাড়ে। 

তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী দিনাজপুরে এসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। প্রবল আন্দোলনের মুখে ঘটনার পাঁচদিন পর ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির জন্য কবর থেকে ইয়াসমিনের মরদেহ উত্তোলন করা হয়। পরে অভিযুক্ত তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতে তারা দোষী সাব্যস্ত হন। দুই হাজার চার সালে ওই তিন পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। 

এই ঘটনা তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। আজও প্রতি বছর চব্বিশ আগস্ট বিভিন্ন সংগঠন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি ইয়াসমিন হত্যা দিবস হিসেবে পালন করে। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে হয়তো সেই সময়ের ঘটনা অজানা, কিন্তু দিনাজপুরবাসীর কাছে ইয়াসমিনের নাম আজও অন্যায়, নির্যাতন ও বিচার দাবির প্রতীক হয়ে আছে।