মে ২১, ২০২৬, ১০:২১ এএম
দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধানের উৎপাদনে এবার বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর জমির ধান। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় অনেক এলাকায় এবার অর্ধেকেরও কম ফলন পাওয়া গেছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা ও চালের বাজারের জন্য বড় ধরনের চাপের সংকেত।বোরো মৌসুম থেকে দেশের মোট চাল চাহিদার ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ জোগান আসে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর যে জমিতে কৃষকের আড়াই হাজার টন ধান উৎপাদন হয়েছিল, বন্যায় তা নেমে ৯০০ থেকে এক হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। হাতে গোনা যে ধান পাওয়া গেছে, তাও মানসম্মত নয়।স্থানীয় কৃষকরা এখন ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছেন।
অথচ কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান মানতে নারাজ। তাদের দাবি, মোট চাহিদার মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে।মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ ফলন নষ্ট হয়েছে।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে সরকারের মোট লক্ষ্যমাত্রা চার কোটি ৪১ লাখ টন চাল। এর মধ্যে বোরো ধানের অংশ দুই কোটি ২৭ লাখ টন।
সরকারি মজুত বৃদ্ধিতে ১৯ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ১৮ মে পর্যন্ত সংগৃহীত হয়েছে মাত্র ১৮ হাজার ৬৭৯ টন সিদ্ধ চাল। ধান সংগ্রহের পরিমাণ তিন হাজার ৬৫০ টন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সংগ্রহ খুবই ধীর।সরকার মজুত বাড়াতে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট অঞ্চলে মোট বোরো উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জকে বলা হয় দেশের ধানের ভাণ্ডার। এবার এখানেই সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় ঘটেছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলমের মতে, ধানের ঘাটতি দেখা দিলে সরকারকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে, যা বৈশ্বিক বাজারে অস্থিতিশীলতা থাকলে ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
খাদ্য নিরাপত্তার এই ঝুঁকি মোকাবিলায় ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি জরুরি।অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে উৎপাদিত বোরো চাল দিয়ে ছয় থেকে সাত মাসের চাহিদা মেটানো হয়। সুতরাং হাওরের এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে বাজারের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়বে বাড়তি চাপ। তাই শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, হাওরাঞ্চলের জন্য বন্যা-সহনশীল নতুন জাতের ধান ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় কৃষি বিমা ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলায় অসাধু ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সুযোগ বন্ধ করতে হবে।আক্ষেপ, সার, সেচ ও যন্ত্রের খরচ বাড়লেও বাজারে ধানের দাম কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি। অনেক কৃষককে মৌসুমের শুরুতেই কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। কিশোরগঞ্জের নিকলী ও নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর কৃষকদের তথ্যমতে, লাভের স্বপ্ন তো দূরের কথা, এবার মূলধন তোলাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, পরিস্থিতির ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চলছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে কাজ শুরু হয়েছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন