বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬,

হামে আক্রান্ত শিশুর করুণ মৃত্যু: শেষ আকুতি ‘বাবা বুকে নাও’

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

এপ্রিল ১০, ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম

হামে আক্রান্ত শিশুর করুণ মৃত্যু: শেষ আকুতি ‘বাবা বুকে নাও’

ছবি - সংগৃহীত

রাজধানীর একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (পিআইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল ৪ বছর ৩ মাস বয়সী শিশু আকিরা হায়দার আরশি। দুই হাত বাঁধা, ঘাড় ঘোরানোর শক্তি নেই বললেই চলে। তবুও বাবাকে দেখে শেষবারের মতো হাত দুটো একটু উঁচু করার চেষ্টা করেছিল সে। অস্ফুট স্বরে বলেছিল, ‘বাবা আমাকে বুকে নাও। আমাকে পানি দাও।’ কিন্তু চিকিৎসকের কড়া নিষেধ ছিল কাছে যাওয়ার। 

মেয়ের সেই শেষ আবদার মেটাতে পারেননি বাবা আল আমিন। ২ এপ্রিল রাত আটটার পর চিকিৎসকেরা আকিরাকে মৃত ঘোষণা করেন। কলিজার টুকরোকে হারানো সেই বাবার হাহাকারে এখন ভারী হয়ে আছে মিরপুরের টোলারবাগের বাতাস।

আকিরার মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যুসনদে হামের পাশাপাশি শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ, সারা শরীরে জীবাণু সংক্রমণ এবং হৃদ্‌যন্ত্রের জন্মগত ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল আমিন পেশায় একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। 

স্ত্রী সানজিদা হক ও ছোট ছেলে আদিয়ানকে নিয়ে তাঁদের সাজানো সংসার ছিল। কিন্তু একটি মরণব্যাধি আর টিকার সামান্য অবহেলা তাঁদের জীবন থেকে কেড়ে নিল বড় মেয়েকে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মিরপুরের টোলারবাগে শ্বশুরের বাসায় বসে যখন আল আমিন কথা বলছিলেন, তখন তাঁর চারপাশ ঘিরে ছিল মেয়ের অসংখ্য স্মৃতি।মেয়ের মৃত্যুর পর স্ত্রী ও ছেলেকে মাদারীপুরের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন আল আমিন। যে ঘরজুড়ে আকিরার খেলনা আর কোলাহল ছিল, সেই ঘর এখন খাঁ খাঁ করছে। 

আল আমিন বলছিলেন, ঘরের প্রতিটি কোণে মেয়ের স্পর্শ লেগে আছে, যা তাঁর দম বন্ধ করে দিচ্ছে। নানি ও খালার বাসায় এখনো ছড়িয়ে আছে আকিরার পুতুল, মেকআপ বক্স আর শখের খেলনা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই মেয়েটি স্টেথোস্কোপ, গোলাপি মোটরবাইক আর গিটারের বায়না করেছিল। বাবা সেই আবদার পূরণ করেছিলেন, কিন্তু সেগুলো দিয়ে খেলার সময় আকিরা আর পায়নি।

সবচেয়ে বেশি বুক ফেটে যাচ্ছে আকিরার না পরা ঈদের জামাটি দেখে। মিরপুরের একটি মার্কেট থেকে বাবা নিজের পছন্দে নয়, বরং ভিডিও কলে আকিরাকে দেখিয়ে জামাটি কিনেছিলেন। জামার গায়ের ট্যাগটিও এখনো খোলা হয়নি। ২১ মার্চ ঈদের দিনেও আকিরা হাসপাতালের বিছানায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিল। ৮ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সেই লড়াই শেষ হয় ২ এপ্রিল মাদারীপুরের পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার মাধ্যমে।

আকিরার অসুস্থতার শুরুটা ছিল গত ৬ মার্চ। সামান্য জ্বর ও কাশি দেখে পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন ঋতু পরিবর্তনের সাধারণ সমস্যা। কিন্তু দ্রুতই পরিস্থিতি জটিল হতে থাকে। প্রথমে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে এবং পরে চিকিৎসকেরা জানান আকিরা হামে আক্রান্ত। আল আমিনের অভিযোগ, ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ডে থাকাকালীন অন্য আক্রান্ত শিশুদের থেকে তাঁর মেয়ে হামে সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে। নিউমোনিয়া ও হামসহ নানা জটিলতায় টানা ২৭ দিন আকিরাকে পাঁচটি ভিন্ন হাসপাতালে দৌড়াতে হয়েছে। কখনো অক্সিজেন সংকট, কখনো পিআইসিইউর অভাব—এই ছোটাছুটির মধ্যেই আকিরা ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

এই দীর্ঘ চিকিৎসায় আল আমিনকে প্রায় তিন লাখ টাকার বেশি খরচ করতে হয়েছে। অফিস এবং আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় টাকার সংস্থান হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। তবে আল আমিনের কণ্ঠে এখন সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ঝরছে টিকার বিষয়ে। তিনি জানান, জন্মের পর অন্য সব টিকা দেওয়া হলেও আকিরার হামের টিকা (এমআর ভ্যাকসিন) কোনোভাবে বাদ পড়ে গিয়েছিল। তিনি স্বীকার করেন, এটি তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ও গাফিলতি ছিল। আজ তিনি অন্য সব মা-বাবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন যেন টিকার বিষয়ে কেউ সামান্যতম অবহেলা না করেন।

আকিরার স্কুলব্যাগ, হলুদ রঙের ফ্রক আর খেলনাগুলো এখন আল আমিনের কাছে কেবলই দগদগে ক্ষত। তিনি চান আর কোনো মা-বাবার বুক যেন এভাবে খালি না হয়। দেশের প্রতিটি হাসপাতালে যেন পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পিআইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত থাকে, যাতে আকিরাদের মতো শিশুদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে না হয়। চিকিৎসকদের প্রতি আরও মানবিক হওয়ার আকুতি জানিয়ে এই শোকাতুর বাবা এখন কেবল মেয়ের রেখে যাওয়া ছবিগুলোর মধ্যেই নিজের বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজছেন।