নভেম্বর ৭, ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা খাঁচায় স্বাভাবিকভাবে ঘুরে বেড়ানো ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষের স্নায়ুকোষ প্রতিস্থাপনে সাফল্য পেয়েছেন। বাইরে থেকে এদের আচরণে পার্থক্য বোঝা না গেলেও এদের ভেতরে লাখ লাখ সক্রিয় মানব স্নায়ুকোষ কাজ করছে। গবেষকেরা কৃত্রিমভাবে তৈরি মানব কোষপুঞ্জ ইঁদুরের মস্তিষ্কে বসিয়ে একে `এলিয়েন-কর্টিক্যাল মাউস` নাম দিয়েছেন।
গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয় যে, মানুষের স্নায়ুকোষযুক্ত এই ইঁদুর মস্তিষ্কের পারস্পরিক সংযোগ এবং বিভিন্ন জটিল রোগ নিয়ে নতুন গবেষণার দরজা খুলে দেবে। সিজোফ্রেনিয়া, সেরিব্রাল পালসি ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগ গভীরভাবে বুঝতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরীক্ষাগারে এই ইঁদুর তৈরির জন্য গবেষকেরা প্রথমে জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন একটি দল তৈরি করেন, যাদের মস্তিষ্কে সেরিব্রাল কর্টেক্সের প্রায় পুরোটাই এবং হিপোক্যাম্পাসের বেশির ভাগ অংশ অনুপস্থিত ছিল। সাধারণত মস্তিষ্কের বাইরের স্তর কর্টেক্স অনুভূতি, চলাচল, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। আর হিপোক্যাম্পাস ভূমিকা রাখে শিক্ষা ও স্মৃতিতে।
ইঁদুরের বয়স যখন মাত্র দুই দিন, তখন তাদের মস্তিষ্কের ফাঁকা জায়গায় স্টেম সেল থেকে তৈরি `অর্গানয়েড` নামক মানব কোষপুঞ্জ প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রতিটি অর্গানয়েড তৈরি হয়েছিল সুস্থ মানুষের স্টেম সেল দিয়ে এবং একেকটিতে প্রায় এক লাখ মানব কোষ বিদ্যমান ছিল।
এই পরীক্ষায় ইঁদুরের মস্তিষ্ক থেকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ স্নায়ুকোষ সরিয়ে সেখানে আনুমানিক ৪০ লাখ মানব স্নায়ুকোষ বসানো হয়। মোট ২৯টি ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে ২৫টির ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপন সফল হয়।
প্রতিস্থাপনের তিন মাসের মধ্যে মানুষের কোষগুলো আয়তনে প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পায়। এগুলো ইঁদুরের রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফাঁকা জায়গার ৯০ শতাংশের বেশি পূরণ করে। যদিও মানব টিস্যু ইঁদুরের মস্তিষ্কের মোট আয়তনের প্রায় অর্ধেক অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, তবে প্রাণীদের সাধারণ হাঁটাচলা বা ডাকায় কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি।
গবেষকেরা গোলকধাঁধার মধ্য দিয়ে ইঁদুরগুলোকে চালনা করে দেখেন যে, সাধারণ ইঁদুরের তুলনায় মানব কোষ থাকা ইঁদুরগুলো পথ খুঁজে পেতে ভালো পারফর্ম করেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, মানুষের স্নায়ুকোষ তাদের শেখার সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
পরীক্ষায় আরও দেখা যায়, প্রতিস্থাপিত কোষগুলোর কিছু অংশ বিশেষ ধরনের স্নায়ুকোষে রূপান্তরিত হয়েছে। এগুলোকে `ভন ইকোনোমো নিউরন` বলা হয়, যা সাধারণত ইঁদুরের মস্তিষ্কে থাকে না। মানুষ ছাড়াও বনমানুষ, তিমি ও হাতির মতো প্রাণীতে এই কোষ পাওয়া যায়।
পাশাপাশি এটি শিশুদের সেরিব্রাল পালসির চিকিৎসায় গবেষণার নতুন পথ দেখাবে। প্রসবকালীন অক্সিজেনের অভাবে শিশুদের সংবেদনশীল অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জিনগত পরিবর্তন করা এই ইঁদুরগুলোকে কম অক্সিজেনের পরিবেশে রাখলে তাদের হাঁটার ধরন বদলে যায় এবং সমন্বয় কমে যায়, যা রোগের ধরণ বুঝতে সহায়ক।
তবে মস্তিষ্কে অর্গানয়েড প্রতিস্থাপনের ফলে মানবেতর ও প্রাণী সংকর তৈরির নৈতিক সীমা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সচেতনতা রক্ষায় গবেষকেরা প্রতিস্থাপিত কোষগুলোর বয়স ছয় মাস হওয়ার আগেই পরীক্ষা বন্ধ করে দেন, যেন তা বেশি গভীরে সংযোগ তৈরি না করে বা অনুভূতির প্রকাশ না ঘটায়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, এই ধরনের পরীক্ষা যেন কেবল তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণীতেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন