বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬,
মধ্যপ্রাচ্য সংকট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতে হঠাৎ কী নতুন শর্ত সামনে এল?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতে হঠাৎ কী নতুন শর্ত সামনে এল?

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসানে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে নতুন শর্ত সামনে এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ‘অর্থবহভাবে’ কমাতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্যান্সের এই বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটন হয়তো আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে ইরানের সীমিত মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে একই সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ প্রশাসনের অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন। রুবিও স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, যুদ্ধের অবসান হবে ‘ভালোভাবে, অথবা ভালো নয় এমনভাবে’।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আলোচনার বিষয়ে ভিন্ন সুরে কথা বললেও ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য নিয়ে তেহরানের সন্দেহ এখনও কাটেনি। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ ইতোমধ্যে অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছে।

ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরানকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। এজন্য দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে। জেডি ভ্যান্সের যুক্তি, ইরানের যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো ইচ্ছাই না থাকে, তাহলে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার প্রয়োজন কেন হবে।

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে পারমাণবিক চুল্লির জ্বালানি তৈরি করা যায়। তবে অনেক বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করলে সেটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য সাধারণত প্রায় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র-গ্রেড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক বক্তব্যে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের পুরো সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেনি। বরং ‘অর্থবহ হ্রাস’-এর কথা বলা হয়েছে। ফলে সীমিত মাত্রায় সমৃদ্ধকরণের কোনো ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ চুক্তিতে রাখা হবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত থাকলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্যে কঠোর অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে। এথেন্সে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রুবিও বলেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না। তার ভাষায়, বিষয়টি একেবারে সরল—ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা যাবে না। রুবিও আরও দাবি করেন, চুক্তিতে পৌঁছানোর একাধিক সুযোগ ইরান নষ্ট করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখাই ওয়াশিংটনের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছে। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা’র বরাته তিনি বলেন, প্রতিবার আলোচনার টেবিলে বসার পরই ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কেবল আলোচনা নয়, বরং ইরানের সরকারকে উৎখাত করা। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বক্তব্যে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তেহরানে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ন্যায় ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে হওয়া আলোচনা দিয়েই সংঘাতের অবসান সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা কেবল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নয়। তেহরানের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছাড়ার নিশ্চয়তা, লেবাননের সংঘাতের অবসান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—পরমাণু কর্মসূচিতে ইরান কতটা ছাড় দেবে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কতটা অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ কমাতে রাজি হবে।