বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬,
আবরার ফাহাদ

আবরার ফাহাদের ৭ম শাহাদাতবার্ষিকী আজ: বিচার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১০:১৪ এএম

আবরার ফাহাদের ৭ম শাহাদাতবার্ষিকী আজ: বিচার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ বুধবার। ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার তৎকালীন কিছু চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসের জেরে তাকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ছাত্রহত্যার ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল ভিন্নমত দমন ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার এক বর্বরোচিত চেষ্টা। পরবর্তীতে আবরার ফাহাদের এই আত্মত্যাগ দেশজুড়ে আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের অবিস্মরণীয় প্রতীকে রূপ নেয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আবরারের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে কর্মসূচি পালিত হয়েছিল। তবে চলতি বছর সরকারিভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির তথ্য পাওয়া যায়নি। আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু বাদ জোহর ঢাবি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। এছাড়া গতকাল মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের উদ্যোগে আরেকটি দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়ি থেকে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বুয়েটের হলে ফিরেছিলেন আবরার ফাহাদ। তিনি ছিলেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের অর্থাৎ ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। সেদিন রাত ৮টার দিকে তাকে শেরেবাংলা হলের দোতলার ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেয় তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত বুয়েট ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তার মোবাইল ফোন ঘেঁটে ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস এবং মতাদর্শের তথাকথিত প্রমাণ খোঁজা হয়। এরপরই ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। পরবর্তীতে চতুর্থ বর্ষের কয়েকজন নেতাকর্মী এসে তার ওপর দ্বিতীয় দফায় মারধর চালায়।

রাতভর পৈশাচিক নির্যাতনে একপর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েন আবরার। হামলাকারীরা তার নিথর দেহ সিঁড়িতে ফেলে রেখে রাতের খাবার খেতে যায়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত জেনে মরদেহ সিঁড়ি থেকে হলের ক্যান্টিনে এনে রাখা হয় এবং ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়। হলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে আবরারের দেহ ধরাধরি করে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়ে। হল প্রাধ্যক্ষ জাফর ইকবাল খান সে সময় জানিয়েছিলেন, রাত পৌনে তিনটায় খবর পেয়ে বুয়েটের চিকিৎসক গিয়ে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন।

হত্যাকাণ্ডের সরাসরি দৃশ্যপটে ছাত্রলীগ থাকলেও পরবর্তীতে অনুসন্ধানে উঠে আসে বুয়েটের ‘আড়ি পেতে শোনা’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপের ভূমিকা। গ্রুপটি ক্যাম্পাসে ভিন্নমতাবলম্বী ও ধর্মভীরু শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নির্যাতনের প্রেক্ষাপট তৈরি করত। ২০১২ সালে যাত্রা শুরুর পর ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের সময় থেকে গ্রুপটি ইসলামবিদ্বেষী অবস্থান নেয়। বুয়েটকে তথাকথিত ‘শিবিরমুক্ত’ করার নামে ২০১৪ সালে তারা ৪৪ জন শিক্ষার্থীর একটি নিষিদ্ধ তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকার অন্তত ১৪ জন শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের বর্বরোচিত নির্যাতনের শিকার হন। তালিকা তৈরিতে অ্যাডমিন প্যানেলের জাভেদ ইকবাল, মিশকাত আল আলভি ও মাসুদ করিম খানসহ বেশ কয়েকজন জড়িত ছিল।

গ্রুপটির সদস্যরা কাউকে শিবির আখ্যা দিয়ে নির্যাতন করাকে স্বাভাবিক ও বৈধ হিসেবে প্রচার করত। একপর্যায়ে বুয়েট ছাত্রলীগের আগ্রাসন এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নির্যাতনের ভয়ে সহপাঠীরাও আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াতে পারত না। এই নিপীড়নমূলক বাস্তবতার চরম শিকার হন আবরার ফাহাদ। হত্যাকাণ্ডে উসকানির পাশাপাশি বুয়েট প্রশাসনের তৎকালীন নিষ্ক্রিয়তা বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নানা নির্যাতন সম্পর্কে অবগত থাকলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, বরং নীরব সমর্থন জুগিয়েছিল।

আবরার হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখে ছাত্রলীগের ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর বিচারিক আদালত ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ডেথ রেফারেন্স হিসেবে ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি মামলার নথি হাইকোর্টে যায়। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর শুনানি শেষে হাইকোর্ট বেঞ্চ বিচারিক আদালতের দেওয়া ২০ জনের ফাঁসি ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন সাজা বহাল রেখে এক বছর আগে রায় ঘোষণা করে।

রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায়ে সন্তুষ্ট থাকায় কোনো আপিল করেনি, তবে আসামিপক্ষ আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। বর্তমানে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলাটি আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। সাত বছর আগের এই নির্মম ঘটনার দুই ধাপের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলেও চূড়ান্ত রায় পেতে আরও কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিনের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা নিয়ে আবারও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতে, আবরারের হত্যাকাণ্ড ছিল বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের অনিবার্য পরিণতি। শহীদ আবরার ফাহাদ আজ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এক অবিনাশী কণ্ঠস্বর।