বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬,

বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান আইনমন্ত্রীর

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ৮, ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম

বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান আইনমন্ত্রীর

বর্তমান বিশ্বের জটিল ও বহুমাত্রিক সংকট কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। মানবাধিকার রক্ষা ও বৈশ্বিক সংকট উত্তরণে অভিন্ন দায়িত্ববোধ অপরিহার্য।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) তুরস্কের ঐতিহাসিক ইস্তাম্বুল শহরে আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক জাস্টিস সামিট-ইস্তান্বুল, ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, আন্তসীমান্ত সাইবার অপরাধ দমন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগামহীন অগ্রযাত্রাজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো আহ্বান জানান।

আইনমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান বৈশ্বিক আইনি কাঠামো বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মুখে পড়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এক ভূখণ্ডকে অন্য ভূখণ্ডের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছে এবং নাগরিক সেবা সহজ করেছে, কিন্তু একই সাথে সৃষ্টি করেছে নতুন সামাজিক বৈষম্য, বিভাজন ও জটিল আন্তসীমান্ত অপরাধ চক্র। এ ধরনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে নিছক নতুন আইন তৈরি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক অংশীদারত্বের বাস্তব প্রয়োগ।

ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক ও ভূকৌশলগত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মিলনস্থল হিসেবে এই শহর আন্তর্জাতিক সংলাপের সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। তুরস্কের জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘকালীন ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে তিনি দুই দেশের অটুট সংহতির ওপর গুরুত্ব দেন।

বক্তব্যে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দেন আসাদুজ্জামান।

তিনি উল্লেখ করেন, ওই গণআন্দোলনে এক হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ দিয়েছেন এবং প্রায় তিন হাজার মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। আত্মাহুতি দেওয়া মানুষের বেশিরভাগই ছিলেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ শ্রমজীবী নাগরিক, যারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিলেন। এসব সত্য ঘটনা জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পুরোপুরি অঙ্গীকারবদ্ধ। এই সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে অতীতের গুম এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের স্বচ্ছ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকটের মারাত্মক অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় প্রায় ১২ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এই সংকট কেবল বাংলাদেশের একক মানবিক দায় নয়; এটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশ, সামাজিক ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ একা এই বিশাল বৈশ্বিক বোঝা অনির্দিষ্টকাল বহন করতে পারে না এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও তা প্রত্যাশা করা সংগত নয়।

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূল মিয়ানমারে নিহিত। বিশ্বসম্প্রদায়কে সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে এসে নিজ ভূমিতে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে তুরস্কের অবিচল ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে আসাদুজ্জামান বলেন, সংকট শুরুর দিন থেকেই আঙ্কারা দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। কক্সবাজারে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ানের ঐতিহাসিক সফর এবং তুরস্কের কূটনৈতিক সমর্থন বাংলাদেশ শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখে। এই সৌহার্দ্যকে এখন বৈশ্বিক ফোরামে কার্যকর পদক্ষেপে পরিণত করতে হবে।

প্রযুক্তির নেতিবাচক দিক নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, সাইবার অপরাধ, অপপ্রচার ও অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত কোনো ভৌগোলিক সীমানা মানে না। তাই কোনো একটি দেশের একক জাতীয় আইন দিয়ে প্রভাবশালী আন্তসীমান্ত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা বৈশ্বিক ডিজিটাল অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা অবাস্তব।

বাংলাদেশ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রেখে সাইবার অপরাধ দমনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইনি কাঠামো তৈরিতে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি ধনী দেশগুলোর প্রতি প্রযুক্তিগত সহায়তা, ফরেনসিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কার্যকর অংশীদার করার আহ্বান জানান।

আন্তর্জাতিক বিরোধ মীমাংসার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ, সমুদ্র ও সীমান্ত নির্ধারণ, জ্বালানি বাজার ও মেধা সুরক্ষার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বিরোধ দিন দিন জটিল হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থার ভূমিকা অপরিসীম।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির নীতি স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বাংলাদেশ বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি প্রক্রিয়া আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করছে। তবে এ বিচারব্যবস্থা সবার জন্য সমান, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য হতে হবে; ন্যায়বিচার কেবল ক্ষমতাবানদের বিশেষ সুবিধা হতে পারে না।

বিশ্বমঞ্চে কেবল ফাঁকা বুলি বা কাগুজে প্রতিশ্রুতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দেন আসাদুজ্জামান।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে গৃহীত সিদ্ধান্তের বাস্তব রূপায়ন জরুরি। বিশ্ববাসী এখন আর অর্থহীন বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারছে না; কারণ কোনো ফাঁকা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিন্নমূল মানুষের দুর্দশা মেটাতে পারে না কিংবা সহিংসতার ক্ষত নিরাময় করতে পারে না।

৮ ও ৯ অক্টোবরব্যাপী চলমান এই সামিটে বিশ্বের ৭৫টি দেশের আইন ও বিচারমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, খ্যাতনামা আইনবিদ ও গবেষকরা অংশ নিচ্ছেন। যৌথ অভিজ্ঞতার বিনিময়ে সামিটটি একটি কার্যকর ও সাড়াদানকারী বৈশ্বিক বিচারকাঠামো গঠনে পথ দেখাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।