বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬,

৬৮ আসন ও নতুন সমীকরণ: জামায়াতে ইসলামীর উত্থান কি অবধারিত?

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম

৬৮ আসন ও নতুন সমীকরণ: জামায়াতে ইসলামীর উত্থান কি অবধারিত?

সংসদে জামায়াতের উত্থান

শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে যখন নতুন সরকার গঠনের ব্যাপক তৎপরতা চলছে, তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে নির্বাচনের এক অভাবনীয় ও রহস্যময় ফলাফল। এবারের নির্বাচনে বিএনপি ২১২টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পর্দার অন্তরালে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। 

দীর্ঘ সময় রাজপথের রাজনীতিতে কোণঠাসা থাকার পর দলটি এবার সংসদে এককভাবে ৬৮টি আসন লাভ করেছে। এটি কেবল একটি নির্বাচনী সংখ্যা নয় বরং বাংলাদেশের প্রথাগত রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল পরিবর্তনের সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও প্রথিতযশা বিশ্লেষকগণ জামায়াতের এই নতুন শক্তিতে আবির্ভাবকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন।

ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মতো বিশ্বসেরা গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে জামায়াতে ইসলামী এখন নিজেদের একটি আধুনিক ও মডারেট রাজনৈতিক সংস্করণে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে। 

অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ এই উত্থানকে ২০০২ সালে তুরস্কে রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন একে পার্টির উত্থানের সাথে সরাসরি তুলনা করছেন। একে পার্টি যেভাবে কেবল ধর্মীয় শরিয়তের স্লোগানের বদলে উন্নয়ন, সুশাসন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে ক্ষমতায় এসেছিল, জামায়াতও বর্তমানে সেই একই পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রগতিশীল ইসলাম ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভয়ের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্যতা তৈরির কৌশল অবলম্বন করেছে। 

বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে তাদের সুশৃঙ্খল অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয় দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বিএনপি যদি সরকার পরিচালনায় প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে না পারে কিংবা বড় কোনো প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগে জড়িয়ে পড়ে, তবে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে জামায়াতে ইসলামী একটি শক্তিশালী দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। তবে এই অগ্রযাত্রায় দলটির সামনে কিছু মৌলিক ও ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে। 

বাংলাদেশের মোট ভোটারের অর্ধেক নারী এবং ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি নারী সমাজের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ও সংশয় লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা বা রাজনৈতিক অবস্থানের বোঝা আজও তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জামায়াত যদি সামনের দিনগুলোতে জাতীয় রাজনীতিতে আরও বড় কোনো ভূমিকা পালন করতে চায়, তবে তাদের এমন কিছু সাহসী ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে নারী সমাজসহ সাধারণ নাগরিকরা পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করেন।

বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াতের এই শক্ত অবস্থান নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে। বিশেষ করে ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে দলটির বিপুল বিজয় আন্তর্জাতিক মহলেও বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শীতের এই কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের শপথ গ্রহণের প্রস্তুতির মাঝেও একটি মৌলিক প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে যে আগামীর সিংহাসনে এই নতুন সমীকরণ কতটা প্রভাব ফেলবে। জামায়াতে ইসলামী কি শেষ পর্যন্ত নিজেদের একটি গ্রহণযোগ্য ও আধুনিক গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না কি পুরনো মতাদর্শের ছায়া তাদের পেছনেই থেকে যাবে তা সময়ই বলে দেবে। আপাতদৃষ্টিতে দলটির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নতুন নেতৃত্বের ধরণ এক নতুন যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।