শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬,
মালয়েশিয়ায় ইতিহাস

আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম বাংলাদেশের এহতিশামুল হক হিরা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১০, ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম বাংলাদেশের এহতিশামুল হক হিরা

মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক কোরআন তিলাওয়াত ও হিফজ প্রতিযোগিতায় পুরুষদের হিফজ বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন বাংলাদেশের কৃতি সন্তান এহতিশামুল হক হিরা। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এই গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যে দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বইছে এবং মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরাও তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন।

ঢাকার মারকাযু ফয়জিল কোরআন আল ইসলামী প্রতিষ্ঠানের এই প্রতিযোগী ৯৭ নম্বর পেয়ে যৌথভাবে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হিরার সঙ্গে যৌথভাবে প্রথম স্থানে রয়েছে সিরিয়ার আবদুল রহমান জামাল ইব্রাহিম। এছাড়া এ বিভাগে ৯৬ দশমিক ৩৩ নম্বর পেয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন স্বাগতিক মালয়েশিয়ার মুহাম্মদ ইজ্জুল আফনান সাজালি।

কুয়ালালামপুরের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে পাঁচ দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। গত মঙ্গলবার প্রতিযোগিতাটি শুরু হয়ে শুক্রবার পর্যন্ত স্থায়ী হয়। গত ৬ অক্টোবর জমকালো এই প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। শনিবার বিজয়ী প্রতিযোগীদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সাফল্যের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। ১৯৮২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ পর্যন্ত ৩৫ জন বাংলাদেশি হাফেজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মোট ৪৩টি প্রথম স্থান অর্জন করার গৌরব অর্জন করেছেন। একই হাফেজ একাধিক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কারণে বিজয়ীর সংখ্যা ৩৫ হলেও প্রথম স্থান অর্জনের সংখ্যা ৪৩টি।

মালয়েশিয়ায় এবারের আসরে অন্যান্য বিভাগেও বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। নারীদের তিলাওয়াত বিভাগে স্বাগতিক মালয়েশিয়ার নুর শাকুরা মোহাম্মদ মুসা ৯১ দশমিক ৮৩ নম্বর পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। এ বিভাগে সিঙ্গাপুরের আতিকাহ বিনতে সুহাইমি ৯১ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় এবং ব্রুনেইয়ের দায়াংকু সিতি উম্মি শায়জানা বিনতে পেঙ্গিরান হাজি মারজুকি ৯০ দশমিক ৮৩ নম্বর পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।

পুরুষদের তিলাওয়াত বিভাগে ইন্দোনেশিয়ার মুহাম্মদ ফাউজি রিদওয়ান ৯৪ দশমিক ৬৭ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। এছাড়া মালয়েশিয়ার সিক হাসনুল তাকিয়ুদ্দিন সিক সাজালি ৯২ দশমিক ৯৯ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় এবং বেলজিয়ামের ব্রাহিম বুগালাব ৯২ দশমিক ১৭ নম্বর পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।

নারীদের হিফজ বিভাগে নাইজারের চাফাতু ইসুফু ৯৬ দশমিক ১৭ নম্বর পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। এ বিভাগে লিবিয়ার মিন্নাহ আলী আলসুদানি আগনাইয়াহ ৯৫ দশমিক ৫০ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় এবং মিয়ানমারের থেইন গি মোন ৯৫ নম্বর পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন।

আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সাফল্যের সূচনা হয়েছিল ১৯৮২ সালে লিবিয়ায় কারি আবদুল হকের প্রথম স্থান অর্জনের মধ্য দিয়ে। হুফ্ফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, তিনিই আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে প্রথম স্থান অর্জনকারী হাফেজ।

এরপর দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ১৯৯৪ সালে ইরানে সাখাওয়াত হোসাইন এবং ১৯৯৬ সালে একই দেশে মাহমুদুল হাসান প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯৯৯ সালে মিশরে ইমদাদুল্লাহ এবং ইরানে ফরিদ আহমদ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ২০০০ সালে মিশরে নাবিল ওয়ালিদ, ২০০১ সালে ইব্রাহিম বিন হেলাল, ২০০২ সালে জর্ডানে হোসাইন আহমাদ এবং ২০০৩ সালে মিশরে আবদুল কাদির প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন।

পরবর্তী বছরগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত থাকে। ২০০৭ সালে দুবাইয়ে প্রথম হন ফজলে রাব্বি আদেল, যিনি ২০০৯ সালে মিশরেও প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০১০ সালে জর্ডানে মো. সাইফুল ইসলাম এবং ২০১১ সালে ইরানে হাফেজ সালাহউদ্দিন চ্যাম্পিয়ন হন। ২০১২ সালে সৌদি আরবে পৃথক বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন মো. তানভীর হোসাইন, এহসান উদ্দিন নোমান ও মুহাম্মদ সাদ সুরাইল। ২০১৩ সালে সৌদি আরবে মো. ইমাদুল্লাহ, জর্ডানে ফারিয়া তাসলিম এবং দুবাইয়ে হাফেজ নাজমুস সাকিব প্রথম হন। পরের বছর সৌদি আরবেও প্রথম স্থান অর্জন করেন নাজমুস সাকিব, এবং একই বছর মিশরে ২১তম আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় প্রথম হন হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া।

২০১৫ সালে সুদানে প্রথম হন নাজমুস সাকিব। একই বছর মিশরে পৃথক বিভাগে নাহিয়ান কায়সার ও মুহিব্বুল্লাহ এবং জর্ডানে সাঈদ হাসান প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০১৬ সালে তুরস্কে আবদুল আখের এবং বাহরাইনে হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া চ্যাম্পিয়ন হন। ২০১৭ সালে সৌদি আরব ও মিশরে আবদুল্লাহ আল মামুন এবং দুবাইয়ে তারিকুল ইসলাম প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০১৮ সালে মিশরে মুজাহিদুল ইসলাম এবং ২০১৯ সালে জর্ডানে মো. সাইফুর রহমান ত্বাকী চ্যাম্পিয়ন হন।

২০২১ সালে ইরান এবং ২০২৩ সালে দুবাইয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিম। ২০২৪ সালে ইরানে বশির আহমদ, সৌদি আরবে আনাস বিন আতিক, তুরস্কে মুআজ মাহমুদ, কুয়েতে আনাস মাহফুজ এবং সেনেগালে অনুষ্ঠিত ১১তম আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় হাফেজ আবু রাইহান প্রথম হন। একই বছর সৌদি আরবে হিফজুল কোরআনের ১৫ পারা বিভাগেও প্রথম স্থান অর্জন করেন মুআজ মাহমুদ।

২০২৫ সালে মিশরে প্রথম হন আনাস বিন আতিক। আর ২০২৬ সালে মালয়েশিয়ায় হাফেজ ইব্রাহিম শেখ এবং সৌদি আরবে ১৫ পারা হিফজ বিভাগে হাফেজ মোহাম্মদ নুরুদ্দিন জাকারিয়া প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের সংরক্ষিত তথ্যে ১৯৯৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের হাফেজদের ৩৭টি প্রথম স্থান অর্জনের তথ্য রয়েছে। এর বাইরে ১৯৮২ সালের কারি আবদুল হকের সাফল্য এবং ২০১৪, ২০১৫, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের কয়েকটি বিজয়ের তথ্য হুফ্ফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক কিরাত সংস্থা বাংলাদেশ থেকে পাওয়া গেছে। বিভিন্ন উৎসের তথ্য সমন্বয় করে ১৯৮২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ৪৩টি প্রথম স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

১৯৮২ সালে লিবিয়ায় কারি আবদুল হকের প্রথম স্থান অর্জনের মধ্য দিয়ে যে সাফল্যের ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল, তা ২০২৬ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ৩৫ জন বাংলাদেশি হাফেজের ৪৩টি প্রথম স্থান অর্জনের এই হিসাব দেশের হিফজ শিক্ষার দীর্ঘদিনের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে। এখন এই ঐতিহাসিক অর্জন ধরে রাখার পাশাপাশি তাজবিদ, ওয়াকফ-ইবতিদা, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও গুণীজনেরা।