বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬,
পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষ

চট্টগ্রামের পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের শঙ্কা ও ঝুঁকিতে ৬ কারখানা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

নভেম্বর ৪, ২০২৬, ১২:১৩ পিএম

চট্টগ্রামের পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের শঙ্কা ও ঝুঁকিতে ৬ কারখানা

ছবি: সংগৃহীত

বেতন বৃদ্ধি ও আর্থিক পাওনা পরিশোধের দাবিতে ঢাকা, আশুলিয়া ও গাজীপুরের তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চলে চলা শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও ছড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকার অন্তত ছয়টি পোশাক কারখানাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি জোরদার করেছে জেলা শিল্প পুলিশ।

শিল্প কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যাতে উসকানি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, চট্টগ্রামে এই মুহূর্তে বড় ধরনের কোনো অস্থিরতার আশঙ্কা নেই। এরপরও বিষয়টি হালকাভাবে না নিয়ে প্রশাসনের মধ্যস্থতায় মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ চলছে।

রাজধানী ঢাকা ও আশুলিয়ায় গত চার দিন ধরে মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় ৩৪০টি সচল পোশাক কারখানায় এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও রাজধানীর এই অসন্তোষের প্রভাব এখানেও পড়ার ভয় তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামে গত ১০ মাসে ২৯টি বড় পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শ্রমিকই বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এর বাইরে নগরীর মোহরা, পাহাড়তলী ও ডবলমুরিং এলাকার নতুন করে ছয়টি কারখানায় চরম শ্রমিক অসন্তোষের ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে চার হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মরত।

শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, অতীতে চট্টগ্রামে শ্রমিক অসন্তোষের ধরণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি কারখানায় আন্দোলন শুরু হলে তা দ্রুত আশপাশের অন্য কারখানাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নেয়।

শিল্প পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রামে বিভিন্ন দাবি আদায়ে মোট ১৩২টি বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এর মধ্যে ৯৬টি আন্দোলনই ছিল পোশাক কারখানাকেন্দ্রিক। মূলত সময়মতো বেতন-ভাতা না দেওয়া, শ্রমিক ছাঁটাই, সার্ভিস চার্জ এবং ছাঁটাইকৃতদের পাওনা পরিশোধ না করার কারণে শ্রমিকরা রাজপথে নামতে বাধ্য হন।

সম্প্রতি গত সেপ্টেম্বরে তিন মাসের বকেয়া বেতন, ছুটির টাকা, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির দাবিতে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন মডেল সিজন লিমিটেডের প্রায় এক হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা।

এর আগে গত মে মাসের শুরুতে চান্দগাঁওয়ের সিঅ্যান্ডবি মোড়ে আজিম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা বকেয়া টিফিন ভাতা ও ওভারটাইমের টাকার দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন। গত মার্চে অলংকার মোড়ে এবং ১৯ আগস্ট আতুরার ডিপোর জিন্স কারখানায় বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা রাজপথে নামেন।

এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রামে ছোট-বড় ৫৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, যার মধ্যে ২৯টিই পোশাক কারখানা। বর্তমানে যে ছয়টি কারখানা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে সেগুলো হলো—মোডিস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, মোডিস্ট সিইপিজেড লিমিটেড, কমফোর্ট গার্মেন্টস লিমিটেড, ওয়েল কোম্পানি লিমিটেড, ওয়েল ফেব্রিক্স লিমিটেড এবং বিএনও লুব্রিকেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড।

ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা ওয়েল কোম্পানি ও ওয়েল ফেব্রিক্সের সাবেক শ্রমিক শাফায়েত হোসেন ও জোবায়ের মোহাম্মদ জানান, সেখানে প্রায় সময় দুই মাসের বেতন বকেয়া থাকত এবং অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক পেতে হয়রানি হতে হতো। তবে অভিযোগের বিষয়ে ওয়েল কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক তপন কুমার বিশ্বাস জানান, কার্যাদেশ কম থাকায় সাময়িক সমস্যা হলেও চলতি মাসের মধ্যেই সব বকেয়া পরিশোধ করা হবে।

চট্টগ্রামের সার্বিক বিষয়ে জেলা শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম জানান, ঢাকার অসন্তোষ যাতে চট্টগ্রামে না ছড়ায় সে ব্যাপারে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং মালিকপক্ষ বকেয়া পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

অন্যদিকে মোডিস্টের কারখানার বিষয়ে বেপজার চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক শরীফুল আলম জানান, ব্যবস্থাপনা পর্ষদ পরিবর্তনের কারণে সেখানে কিছু সমস্যা হলেও বকেয়া বেতনের সমাধানের চেষ্টা চলছে।

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে চট্টগ্রামে সচল পোশাক কারখানার সংখ্যা ৬১০টি থাকলেও ২০২৬ সালের অক্টোবরে তা কমে ৩৩৬টিতে নেমে এসেছে। ফলে জাতীয় পোশাক রপ্তানিতে চট্টগ্রামের অবদান ৪০ শতাংশ থেকে কমে এখন ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী জানান, চট্টগ্রামে বড় কোনো সংঘাতের শঙ্কা না থাকলেও পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।