নভেম্বর ৪, ২০২৬, ১১:১২ এএম
বান্দার সঙ্গে মহান সৃষ্টিকর্তার সরাসরি যোগাযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর মাধ্যম হলো দোয়া। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-মু’মিনের ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, `তোমরা আমার কাছে দোয়া করো, আমি তোমাদের দোয়া কবুল করব।`
তবে অনেক সময় আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করার পরও তাৎক্ষণিকভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে অনেকেই হতাশায় ভোগেন কিংবা মনে করেন তাদের দোয়া কবুল হচ্ছে না। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক এক অনলাইন আলোচনায় বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান, কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত সঠিক নিয়ম মেনে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা কখনোই বান্দাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না। তবে দোয়া কবুলের পদ্ধতি ও বাহ্যিক প্রকাশ বিভিন্ন উপায়ে হতে পারে, যা বান্দার জন্য সর্বাবস্থায় কল্যাণ বহন করে আনে।
শায়খ আহমাদুল্লাহর আলোচনার ভিত্তিতে দোয়া কবুলের বিভিন্ন রূপ, মৌলিক পূর্বশর্ত ও সুন্নাহসম্মত আদবসমূহ নিম্নে তুলে ধরা হলো।
দোয়া কবুলের বৈচিত্র্যময় তিনটি রূপ
সাধারণত আল্লাহর কাছে যা চাওয়া হয় হুবহু সেটি পাওয়াই দোয়া কবুলের একমাত্র উপায় বলে ধারণা করা হয়। তবে শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, হাদিসের বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী দোয়া মূলত তিনটি ভিন্ন উপায়ে কবুল হতে পারে।
প্রথমত, বান্দা সরাসরি যা চেয়েছে আল্লাহ তাআলা তাকে হুবহু সেটিই দান করেন।
দ্বিতীয়ত, বান্দা নিজের জন্য যা চেয়েছে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয় ও অধিক কল্যাণকর কোনো বিষয়—হয়তো যা সে চাইতে ভুলে গেছে বা জানত না—আল্লাহ তাকে সেটি দান করেন। উদাহরণস্বরূপ, সন্তান মা-বাবার কাছে ক্ষতিকর কিছু চাইলে অভিভাবকরা তা না দিয়ে তার চেয়ে উত্তম কিছু কিনে দেন, যা সন্তানের প্রকৃত চাওয়া পূরণ করে।
তৃতীয়ত, দুনিয়াতে হুবহু কিছু না দিয়ে আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর পর আখেরাতে এর বিনিময়ে বিপুল সওয়াব ও মহা-প্রতিদান সঞ্চিত রাখেন।
মুস্তাদরাকে হাকিমসহ বিভিন্ন হাদিসের বর্ণনায় দোয়ার এই বিভিন্ন উপায়ের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তাই তৎক্ষণাৎ কাঙ্ক্ষিত জিনিস না পেলেই `দোয়া কবুল হয়নি` এমন মনে করার কোনো সুযোগ নেই।
দোয়া কবুলের প্রধান পূর্বশর্ত হালাল উপার্জন
দোয়া কবুল হওয়ার জন্য সবচেয়ে মৌলিক ও প্রধান শর্ত হলো জীবনযাত্রায় হালাল উপার্জন ও হালাল খাদ্য গ্রহণ বজায় রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যার দেহাংশ বা সম্পদ হারাম দ্বারা গঠিত ও পালিত, তার দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? তাই দোয়ার আশাতীত সুফল পেতে হলে উপার্জন ও খাদ্য তালিকা সম্পূর্ণ হালাল হওয়া আবশ্যক।
সুন্নাহসম্মত দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ আদব ও নিয়মাবলী
দোয়া পেশ করার সময় সুন্নাহসম্মত বেশ কিছু আদব বা নিয়ম মেনে চলা উচিত:
কেবলামুখী হওয়া: যেকোনো দিকে মুখ করে দোয়া করা জায়েজ হলেও কেবলামুখী হয়ে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বৃদ্ধি পায়।
দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করা: দোয়ার সময় মনে কোনো প্রকার সংশয় না রেখে পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে যে আল্লাহ অবশ্যই এটি কবুল করবেন। `কবুল হতেও পারে, নাও পারে`—এমন দ্বিধাগ্রস্ত মানসিকতা নিয়ে দোয়া করা যাবে না।
আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ পাঠ: দোয়া শুরু করার পূর্বে মহান আল্লাহর হামদ বা প্রশংসা জ্ঞাপন করা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করে তারপর নিজের চাহিদা উপস্থাপন করা সুন্নাত।
দুই হাত তুলে প্রার্থনা করা: যদিও হাত তোলা ছাড়াও দোয়া করা যায়, তবে দুই হাত তুলে দোয়া করা দোয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদব। হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত লজ্জাশীল ও সম্মানিত; বান্দা যখন দুই হাত তুলে দোয়া করে, তখন তা খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে তিনি লজ্জাবোধ করেন।
আল্লাহর গুণবাচক নাম (আসমাউল হুসনা) ব্যবহার: দোয়ার মধ্যে আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম, যেমন—`ইয়া আল্লাহ`, `ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম`, `ইয়া রহমান`, `ইয়া রহিম` ইত্যাদি নাম ধরে ডেকে আকুতি জানানো সুন্নাতের অংশ।
তাড়াহুড়া না করা ও ধৈর্য ধারণ
দোয়া করার পর তা পূরণের জন্য মোটেও তাড়াহুড়া বা অস্থিরতা প্রকাশ করা যাবে না। নবী করিম (সা.) বলেছেন, বান্দার দোয়া ততক্ষণ কবুল হতে থাকে যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে, `আমি তো অনেক দোয়া করলাম, কিন্তু কবুল হলো না`। শর্ত মেনে দোয়া করার পর ফলাফলের বিষয়টি পূর্ণ ভরসার সঙ্গে আল্লাহর ওপর ন্যস্ত রাখা উচিত।
দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত ও স্থানসমূহ
নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ সময়ে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা তা দ্রুত কবুল করেন। এসব মুহূর্তের মধ্যে রয়েছে—ভোর রাতে বা তাহাজ্জুদের সময়, পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর, আজান ও একামতের মধ্যবর্তী সময়, বৃষ্টি বর্ষণের সময় এবং সফর বা ভ্রমণের অবস্থা। এই সময়গুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে দোয়া করা হলে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন