বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৬,
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন

এসএমই খাত বড় হলেই উৎপাদনশীলতা বাড়বে: নাজনীন

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১, ২০২৬, ০১:১৫ পিএম

এসএমই খাত বড় হলেই উৎপাদনশীলতা বাড়বে: নাজনীন

দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের পর্যায়ক্রমে মাঝারি ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা গেলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ। এই খাতের উদ্যোক্তাদের কেবল ঋণ প্রদান করলেই চলবে না, ঋণের পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্ভাবনে নিবিড় কারিগরি সহায়তার সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি : চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব সুপারিশ তুলে ধরেন।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল প্রোডাকটিভিটি অর্গানাইজেশন (এনপিও) এবং দৈনিক যুগান্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব পর্যায়ে গবেষণা ও উন্নয়নের (আরঅ্যান্ডডি) সক্ষমতা থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকেও সরাসরি সহযোগিতা লাভ করে। কিন্তু দেশের তৃণমূলের ছোট উদ্যোক্তাদের এমন আর্থিক বা কারিগরি সামর্থ্য থাকে না। তাই প্রান্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাঝারি ও বৃহৎ পর্যায়ে উন্নীত করার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিলে পরবর্তীকালে তারা নিজেরাই গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে সক্ষম হবে।

একটি ছোট প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে নীতিগত সহায়তা দিলে তা মাঝারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কৌশল নির্ধারণ জরুরি।

উদ্যোগ মাঝারি বা বৃহৎ রূপ নিলে যথাক্রমে ভিন্ন ভিন্ন স্তরের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন হবে।

উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সুষম সমন্বয় প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, সমন্বয়ের পূর্বে খতিয়ে দেখতে হবে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে কাজের অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি ঘটছে কি না। কারণ বিভিন্ন স্তরের উদ্যোক্তাদের বাস্তব চাহিদার ভিন্নতা থাকায় সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রশিক্ষণ বা সরকারি সুবিধা সমান কার্যকর হয় না। নতুন কোনো ভৌত অবকাঠামো তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

এসএমই ফাউন্ডেশন প্রদত্ত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোকে সমসাময়িক উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তির রূপান্তর এবং খাতভিত্তিক চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে নিয়মিত আধুনিকায়ন করতে হবে।

ভবিষ্যতে কোন কোন খাতের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে ফাউন্ডেশনের অগ্রাধিকার খাতগুলো নিয়মিত হালনাগাদ করার পরামর্শ দেন তিনি।

জাতীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সরকারের পাশাপাশি এনপিও এবং দেশের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার ওপর জোর দেন তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় প্রশিক্ষণের পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রমও নিয়মিত বিরতিতে পরিবর্তন করা দরকার। প্রযুক্তির প্রয়োগ ও আধুনিক অটোমেশন প্রক্রিয়ায় মানবসম্পদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য কেবল শ্রমশক্তি সংকুচিত করা হওয়া উচিত নয়।

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিকদের সক্ষমতা বাড়িয়ে তাদের আরও উৎপাদনশীল করে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

তিনি স্পষ্ট করেন, দেশ দক্ষ জনশক্তি প্রত্যাশা করে; কারখানাগুলোতে কেবল আধুনিক যন্ত্রপাতি বসিয়ে সাধারণ মানুষকে কর্মহীন করা কোনো টেকসই নীতি হতে পারে না।

কর্মক্ষেত্রে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির সীমাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরে ২০১৮ সালের একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দেন ড. নাজনীন আহমেদ। সেই সময় তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ ছিল প্রায় ৬২ শতাংশ। গবেষণাকালে তিনি লক্ষ্য করেন, অটোমেশন ও প্রযুক্তিভিত্তিক জটিল কাজে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে নারী শ্রমিকেরা বাস্তব প্রতিবন্ধকতার শিকার হন।

পুরুষ শ্রমিকেরা কর্মঘণ্টার বাইরে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পেলেও নারীদের কর্মস্থল শেষে গৃহস্থালি কাজ ও পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে হয়।

ফলে নারীদের পক্ষে কাজের বাইরে বাড়তি সময় বের করে প্রশিক্ষণ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির স্বার্থে নারী কর্মীদের দৈনিক কর্মঘণ্টার ভেতরেই প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তিনি।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে ঋণের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন এই অর্থনীতিবিদ।

পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের মাধ্যমে যেসব ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে, তার একটি নির্দিষ্ট অংশ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কারিগরি পরামর্শ নেওয়ার সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে।

একজন উদ্যোক্তা ঋণ গ্রহণের পর কোনো প্রতিষ্ঠিত কারিগরি প্রতিষ্ঠান বা অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা বা মান নিয়ন্ত্রণের সহায়তা নিতে পারবেন—এমন একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষস্থানীয় বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগানো যেতে পারে।

সরকারের মূল ভূমিকা হওয়া উচিত সহায়ক ক্ষেত্র প্রস্তুত করা, সব কাজ এককভাবে পরিচালনা করা নয়।

এসএমই উদ্যোক্তারা যেন ঋণ সহায়তার মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদনশীলতার সেবা গ্রহণে আগ্রহী হন, সেই প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।

দক্ষতা উন্নয়নের পরিধি সম্প্রসারণে বেসরকারি খাতের প্রশিক্ষণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি সহায়তা কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি। সরকারি প্রতিষ্ঠান বা এসএমই ফাউন্ডেশনের একার পক্ষে দেশের বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তা ও কারখানার সব শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই শিল্প উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় আনা যেতে পারে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রসারিত হলে তৃণমূল পর্যায়ে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষকে কার্যকর দক্ষতার আওতায় আনা সম্ভব হবে।

ব্যবহারিক প্রশিক্ষণে শিল্পকারখানাগুলোতে ইতিমধ্যে বিদ্যমান যন্ত্রপাতি এবং চলমান কাজের পরিবেশকে সরাসরি কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরির পক্ষে মত দেন তিনি। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সরাসরি কারখানার কাজের সঙ্গে সমন্বিত হলে তা সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়। প্রশিক্ষক দল সরাসরি কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের বাস্তব কাজের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ প্রশিক্ষণ দিলে কর্মীরা যেমন বাস্তব অভিজ্ঞতা পাবেন, কারখানাগুলোও দ্রুত সেই প্রশিক্ষণের প্রত্যক্ষ সুফল ভোগ করবে।

সর্বোপরি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে অবকাঠামোগত ব্যয়ের চেয়ে সরকারের সহায়ক ও প্রণোদনামূলক নীতিগত অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে উদ্ভাবন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ধাপে ধাপে তাদের বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার সুযোগ অবারিত করার আহ্বান জানান তিনি।