বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬,

অর্গানিক খাবার কি সত্যি স্বাস্থ্যকর নাকি শুধুই প্রচার

স্বাস্থ্য ডেস্ক

আগস্ট ১৪, ২০২৬, ১২:৪৭ এএম

অর্গানিক খাবার কি সত্যি স্বাস্থ্যকর নাকি শুধুই প্রচার

Ai - ছবি

অর্গানিক খাবারের বাজার এখন বিশ্বজুড়ে তুঙ্গে। সাধারণ পণ্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে এসব খাদ্যসামগ্রী কিনে নিচ্ছেন স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ।কিন্তু দামের সেই ফারাক কি আসলেই বাড়তি পুষ্টি বা শতভাগ নিরাপত্তা দিতে পারছে।বাস্তবতা হলো অর্গানিক শব্দটির পেছনের আন্তর্জাতিক কৃষি নীতি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য অনেক ক্রেতার জন্যই অস্পষ্ট। অধিকাংশ মানুষের ধারণা অর্গানিক খাবার মানেই সম্পূর্ণ বিষমুক্ত, কীটনাশকহীন এবং প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কোনো ফসল। তবে আন্তর্জাতিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অর্গানিক চাষাবাদ মূলত একটি সুনির্দিষ্ট খামার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। এটি সম্পূর্ণ অলৌকিক কোনো রাসায়নিক মুক্ত ব্যবস্থা নয়।

কৃষি নীতি অনুযায়ী অর্গানিক চাষাবাদে যে জমি ব্যবহার করা হবে, সেখানে টানা তিন বছর কোনো ধরনের কৃত্রিম রাসায়নিক সার বা সিন্থেটিক কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি এতে জিনগত পরিবর্তন করা ফসল বা তেজস্ক্রিয় বিকিরণ প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পুরো প্রক্রিয়াটি বছরে অন্তত একবার স্বাধীন কোনো তৃতীয় পক্ষ দ্বারা সরেজমিনে পরিদর্শন ও অডিট করা বাধ্যতামূলক। এছাড়া খাদ্য সরবরাহের পুরো ধাপে প্রতিটি রাসায়নিকের হিসাব বা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকতে হয়।সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি ঘটে কীটনাশকের প্রয়োগ নিয়ে। প্রচলিত ধারণা হলেও অর্গানিক চাষে একেবারেই কীটনাশক ব্যবহার হয় না — কথাটি সঠিক নয়।

অর্গানিক খামারেও অনুমোদিত মাত্রায় কপার সালফেট বা সালফারের মতো জৈব ও প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি কীটনাশক প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ মাটিতে বাণিজ্যিকভাবে সম্পূর্ণ অর্গানিক ফসল উৎপাদন করা প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত কারণেই অত্যন্ত দুরুহ। দেশে সবজি বা ফসল উৎপাদনে দীর্ঘ বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ সবজি চাষে প্রতি মৌসুমে কৃষকরা গড়ে ১৭ থেকে ১৫০ বার পর্যন্ত কীটনাশক ছিটিয়ে থাকেন। এদের মধ্যে বড় অংশই না জেনে মাত্রার অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করেন, যার মধ্যে অনেক রাসায়নিক উন্নত বিশ্বে বহু আগে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

দীর্ঘকালের এই অতি-ব্যবহারের কারণে কৃষিজমির ভূগর্ভস্থ পানি ও পার্শ্ববর্তী পানির উৎসগুলো মারাত্মকভাবে রাসায়নিক পদার্থের দ্বারা কন্টামিনেটেড বা দূষিত হয়ে পড়েছে। যদি কোনো কৃষক ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিন বছর কৃত্রিম সার বর্জন করে চাষ শুরুও করেন, তাহলেও সেচে ব্যবহৃত এই রাসায়নিকমিশ্রিত পানি এড়ানোর উপায় থাকে না। ফলে মাটি ও পানির এই সমন্বিত দূষণের কারণে দেশীয় উৎপাদিত পণ্য পুরোপুরি অর্গানিক হওয়া প্রায় অসম্ভব।

অধিকন্তু বাংলাদেশে খাদ্য পণ্যের অর্গানিক মান নিশ্চিত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোনো জাতীয় অডিট ও সার্টিফিকেট প্রদানকারী স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ গড়ে ওঠেনি। বাজারে যেসব পণ্যে অর্গানিক সিল বা লেবেল দেখা যায়, তা মূলত উৎপাদনকারী বা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দাবি। স্বাধীন কোনো তদন্ত বা অডিট রিপোর্ট না থাকায় এসব দাবির স্বচ্ছতা প্রমাণের আন্তর্জাতিক কোনো সুযোগ থাকে না।

বিদেশ থেকে আমদানিকৃত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সিলযুক্ত অর্গানিক খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও শতভাগ সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকে না। আন্তর্জাতিক খাদ্য তদারকি সংস্থার নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অন্যান্য দেশ থেকে আমদানিকৃত অর্গানিক পণ্যের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে মাত্র ২ শতাংশ খামার সরাসরি সরজমিন অডিটের মুখোমুখি হয়। বাকি বিশাল অংশের ক্ষেত্রে অডিট প্রক্রিয়ার এই ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও ভুয়া সার্টিফাইড পণ্য বিক্রির রেকর্ড রয়েছে। নথিপত্র অনুযায়ী ২০১১ সাল থেকে আন্তর্জাতিক তদারকি সংস্থাই বহু কোটি ডলারের ভুয়া অর্গানিক জালিয়াতির নজির নথিবদ্ধ করেছে।

অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠতে পারে, আসল অর্গানিক খাবার হাতে পাওয়া গেলে কি তাতে সাধারণ খাবারের চেয়ে অনেক বেশি ভিটামিন ও পুষ্টি পাওয়া যাবে। বিজ্ঞান কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত একটি বিশাল বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ১৯৫৮ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৫০ বছরের আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, সাধারণ খাবার ও অর্গানিক খাবারের পুষ্টিগুণে কোনো উল্লেখযোগ্য বা বড় ধরনের পার্থক্য নেই।

পরবর্তীতে ২০১২ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ১৯৬৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত করা সব গবেষণার তথ্য পুনর্বিশ্লেষণ করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছান। সেখানেও অর্গানিক ও অনর্গানিক পণ্যের পুষ্টিমানের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান পার্থক্য মেলেনি। তবে অর্গানিক খাদ্যে সিন্থেটিক কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ কিছুটা কম পাওয়া গেছে, যা চাষ পদ্ধতির স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও খাদ্য গবেষণার আন্তর্জাতিক তথ্যাবলি স্পষ্ট করছে যে কেবল অর্গানিক লেবেলের ওপর নির্ভর করে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করার সিদ্ধান্ত কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা ক্রেতার নিজস্ব বিচারবুদ্ধির ওপরই নির্ভর করে।অর্গানিক লেবেলের অধীনে উৎপাদিত ও আন্তর্জাতিকভাবে বাজারজাত করা খাবারের রাসায়নিক বিশ্লেষণ সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য এটিই।