সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম
গ্রীষ্মের প্রখর রোদ, ভ্যাপসা গরম আর ক্লান্তিকর জনজীবন সাধারণ মানুষের মনে এমন ধারণাই তৈরি করে যে এ সময় সূর্য বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি চলে এসেছে। অথচ জ্যোতির্বিজ্ঞানের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। উত্তর গোলার্ধে যখন চরম গ্রীষ্মের দাপট চলে, ঠিক তখনই সূর্য থেকে নিজস্ব কক্ষপথের সবচেয়ে দূরবর্তী বিন্দুতে অবস্থান করে পৃথিবী। মহাজাগতিক পরিভাষায় এই দূরবর্তী অবস্থানকে বলা হয় অপসূর। প্রতি বছর জুলাই মাসের শুরুর দিকে উত্তর গোলার্ধের মানুষ যখন তীব্র গরমে ভোগেন, তখন পৃথিবী সূর্য থেকে সর্বাধিক দূরত্বে অবস্থান করে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA-এর হিসাব অনুযায়ী, জুলাই মাসে অপসূর চলাকালে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় নয় কোটি ৪৫ লাখ মাইল বা ১৫ কোটি ২০ লাখ কিলোমিটারে। অন্যদিকে হাড়কাঁপানো শীতের মাস জানুয়ারির শুরুতে পৃথিবী সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকে, যা অনুসূর নামে পরিচিত। সেই সময়ে এই দূরত্ব কমে দাঁড়ায় নয় কোটি ১৪ লাখ মাইল বা ১৪ কোটি ৭০ লাখ কিলোমিটারে। অর্থাৎ বছরের দুই বিপরীত সময়ে দূরত্বের ব্যবধান থাকে প্রায় ৩১ লাখ মাইল বা ৫০ লাখ কিলোমিটারের এক বিশাল ফারাক।
সাধারণ পর্যবেক্ষণে মনে হতে পারে যে আলোর বা আগুনের কাছাকাছি থাকলে যেমন তাপের তীব্রতা বাড়ে, তেমনি দূরবর্তী স্থানে গেলে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ার কথা। কিন্তু সৌরজগতের প্রাকৃতিক নিয়ম সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সমীকরণে পরিচালিত হয়। ঋতু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্বের প্রভাব প্রকৃতপক্ষে নগণ্য। এর আসল বৈজ্ঞানিক রহস্য লুকিয়ে রয়েছে পৃথিবীর নিজস্ব অক্ষীয় ঘূর্ণনের মধ্যে।
মহাশূন্যের বুকে আমাদের পৃথিবী কোনো খাড়া লাটিমের মতো সোজা হয়ে ঘোরে না। এটি কক্ষপথের সমতলের সঙ্গে প্রায় ২৩ দশমিক পাঁচ বা ২৩ দশমিক চার ডিগ্রি কোণে হেলে থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এই চিরন্তন হেলানো অবস্থানের কারণেই পৃথিবীতে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার সার্বিক ঋতুবৈচিত্র্য তৈরি হয়। মহাকাশে পরিভ্রমণের সময় যখন উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে হেলে অবস্থান নেয়, তখন সেখানে স্বাভাবিক নিয়মেই নেমে আসে গ্রীষ্মকাল। হেলে থাকার কারণে সূর্যের প্রখর আলোক রশ্মি ভূপৃষ্ঠের ওপর সোজা বা খাড়াভাবে এসে পড়ে।
একই সঙ্গে দীর্ঘায়িত হয় দিনের পরিধি। একটানা দীর্ঘ সময় খাড়াভাবে সূর্যালোক পাওয়ার কারণে ভূপৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে তাপশক্তি সঞ্চিত হতে থাকে। ফলে ওই সময় সূর্য কক্ষপথের সর্বাধিক দূরত্বে অবস্থান করলেও সরাসরি আপতিত রশ্মির প্রখরতায় ভূপৃষ্ঠ প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর সম্পূর্ণ বিপরীত দৃশ্য দেখা যায় যখন কোনো গোলার্ধ সূর্য থেকে বাইরের দিকে হেলে থাকে।
তখন আলো সরাসরি না পড়ে তির্যকভাবে অর্থাৎ বাঁকা হয়ে প্রবেশ করে। বাঁকা আলো ভূপৃষ্ঠের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় তীব্রতা হারিয়ে ফেলে এবং দিনের স্থায়িত্ব কমে রাতের দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়, যার ফলশ্রুতিতে সেখানে ভর করে শীতকালের শীতল আবহাওয়া। পৃথিবীর এই উপবৃত্তাকার কক্ষপথের কারণে দূরত্বের তারতম্যে সৌর বিকিরণের পরিমাণেও সামান্য পরিবর্তন আসে।
অনুসূর ও অপসূরের দূরত্বের এই তিন দশমিক চার শতাংশ ফারাকের কারণে পৃথিবীতে আসা সৌরশক্তির পরিমাণে পার্থক্য হয় মাত্র ছয় দশমিক আট শতাংশের মতো। দূরত্বের ব্যবধানই যদি ঋতু বদলের মূল কারণ হতো, তবে প্রতি বছর জুলাই মাসে সারা পৃথিবীতে একযোগে চরম দাবদাহ বিরাজ করত। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না। উত্তর গোলার্ধে যখন দাবদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন দক্ষিণ গোলার্ধের অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকায় শান্ত ও শীতল শীতকাল বিরাজ করে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন