বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

সাম্প্রতিক যেসব যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এপ্রিল ৯, ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম

সাম্প্রতিক যেসব যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের পুরো সভ্যতা এক রাতে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আধুনিক সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে প্রবল হলেও ইরানের রণকৌশলের কাছে তারা এক ধরণের নৈতিক পরাজয় বরণ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে স্থানীয়দের প্রতিরোধ এবং ভৌগোলিক কৌশল ব্যবহারের কারণে আমেরিকা বারবার হোঁচট খাচ্ছে।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, গত কয়েক দশকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই দেশটি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত পরাজয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম এবং ইরাক যুদ্ধ।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধ। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছর চলা এই সংঘাতের প্রেক্ষাপট ছিল সমাজতান্ত্রিক উত্তর ভিয়েতনামের অগ্রযাত্রা রোধ করা। তৎকালীন ‘ডোমিনো থিওরি’ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল একটি দেশ কমিউনিস্ট হলে আশপাশের সব দেশ একই পথে হাঁটবে। 

কিন্তু দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সমর্থন দিতে গিয়ে মার্কিন বাহিনী এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় যার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। ভিয়েতনামের ঘন জঙ্গল, গেরিলা যুদ্ধ কৌশল এবং স্থানীয় জনগণের ব্যাপক সমর্থন আমেরিকার আধুনিক প্রযুক্তির সব দম্ভ চূর্ণ করে দেয়। যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা এবং হাজার হাজার সৈন্যের প্রাণহানি খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরেই তীব্র যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৩ সালে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র এবং এর দুই বছরের মাথায় রাজধানী সাইগন পতনের মাধ্যমে পুরো দেশ কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে একত্রিত হয়।

একই ধরণের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি দেখা যায় ২০০৩ সালে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধে। তথাকথিত ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ উদ্ধারের অজুহাতে সাদ্দাম হোসেনের শাসন উচ্ছেদে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। যদিও পরবর্তীতে এমন কোনো অস্ত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক পর্যায়ে মার্কিন বাহিনী দ্রুত রাজধানী বাগদাদ দখল করতে সক্ষম হলেও যুদ্ধ পরবর্তী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। সাদ্দামের পতনের পর ইরাকে দীর্ঘস্থায়ী সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে আল-কায়েদা এবং আইএসের মতো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর উত্থানের পথ প্রশস্ত করে। 

২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা প্রত্যাহার করলেও ইরাক আজ পর্যন্ত এক অস্থিতিশীল জনপদে পরিণত হয়ে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে দ্রুত জয় এলেও কৌশলগত ও রাজনৈতিকভাবে এই যুদ্ধ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় ব্যর্থতা।আমেরিকার ইতিহাসের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধ ছিল আফগানিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর আল-কায়েদা ও তালেবানকে নির্মূল করতে এই অভিযান শুরু হয়। 

দীর্ঘ ২০ বছর পর ২০২১ সালে অত্যন্ত বিশৃঙ্খলভাবে কাবুল ত্যাগের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। অবাক করার বিষয় হলো, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ এবং অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। মার্কিন সমর্থিত আফগান সরকারের দুর্নীতি ও অযোগ্যতা তালেবানকে আবার পুনর্গঠিত হতে সাহায্য করে। শেষ পর্যন্ত একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে না পেরেই যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয় মেনে নিয়ে বিদায় নিতে হয়, যা বিশ্বজুড়ে দেশটির ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র উপদেষ্টা ড. হারলান উলম্যান আল-জাজিরায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই ব্যর্থতাগুলোর ময়নাতদন্ত করেছেন। তার মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টদের যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যতা এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া এই বিপর্যয়গুলোর মূল কারণ। তারা প্রায়ই যুদ্ধের সম্ভাব্য সব পরিণতি বিবেচনা না করেই সামরিক শক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বর্তমান ইরান পরিস্থিতি নিয়েও ট্রাম্প একই ধরণের গোলকধাঁধায় পড়েছেন। 

ইরানের কৌশলগত গভীরতা এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে অবমূল্যায়ন করে কোনো যুদ্ধে জড়ালে তা আমেরিকার প্রেসিডেন্সির জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত হতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, শুধু সামরিক শক্তির জোরে একটি জাতির রাজনৈতিক লক্ষ্য ও জনসমর্থনকে দমন করা সম্ভব নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পরাজয়গুলো থেকে একটি শিক্ষা স্পষ্ট যে, সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তি যুদ্ধের একটি অংশ মাত্র, কিন্তু চূড়ান্ত বিজয় নির্ভর করে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও স্থানীয় প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষমতার ওপর। ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প যে হুমকি দিয়েও পরে পিছু হটেছেন, তা মূলত অতীতের এই তিক্ত অভিজ্ঞতারই একটি প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে একক সামরিক আধিপত্য যে আর কাজ করছে না, তা আমেরিকার এই সাম্প্রতিক সামরিক ইতিহাস থেকেই প্রমাণিত।