শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬,
উত্তাল দিল্লি

দিল্লিতে সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে কড়া নিরাপত্তা: মেট্রো ও ট্রেন চলাচল বন্ধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ১০, ২০২৬, ০৯:৪৫ এএম

দিল্লিতে সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে কড়া নিরাপত্তা: মেট্রো ও ট্রেন চলাচল বন্ধ

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলে রাজনৈতিক কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির কর্মী-সমর্থকদের ঐতিহাসিক জন্তর মন্তরে জমায়েত ঠেকাতে নজিরবিহীন কঠোর অবস্থানে নেমেছে দেশটির সরকার। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল থেকেই গোটা নয়াদিল্লি কার্যত অবরুদ্ধ রূপ নিয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচির কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে সিজেপির পক্ষ থেকে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের ঘোষণা আসায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাজীব চক, নয়াদিল্লি, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, প্যাটেল চক ও কাশ্মীরি গেটসহ দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ফটক পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর সূচি ছিল—এমন আন্তরাজ্য ও স্থানীয় আড়াই শর বেশি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।

জনপথ ও কর্তব্য পথ মোড়ের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধজুড়ে শুক্রবার রাত ১০টা থেকে টানা ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার মুখেও পিছু হটতে নারাজ আন্দোলনকারীরা। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, নানা বিধিনিষেধ জারি থাকলেও তাদের কর্মী ও সমর্থকেরা জন্তর মন্তরের দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখবেন। প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, "একদিকে আপনারা বলছেন, বিক্ষোভের কারণে মানুষের অসুবিধা হবে। অন্যদিকে, আপনারাই মেট্রো ও রেল বন্ধ করে দিয়েছেন এবং সড়ক অবরুদ্ধ করেছেন। এতে কি মানুষের অসুবিধা হবে না?"

নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নয়াদিল্লি জেলার কেন্দ্রস্থলের প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জন্তর মন্তর, জনপথ, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এবং দিল্লি পুলিশের প্রধান কার্যালয়। গুরুত্বপূর্ণ এই বলয়ে একাই সাড়ে ৬ হাজারের বেশি সশস্ত্র পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক নজরে রাখতে স্থাপন করা হয়েছে শব্দ ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ৩০০টির বেশি সিসি ক্যামেরা।

বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র জন্তর মন্তরে যাওয়ার সংযোগ সড়কগুলোতে বসানো হয়েছে অন্তত সাত স্তরের লোহার ব্যারিকেড। ব্যারিকেডের পেছনের কয়েকটি স্তর ওয়েল্ডিং করে জোড়া লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে তা কোনোভাবেই টেনে সরানো না যায়।

জনসমাগম রুখতে সংবেদনশীল মোড়গুলোতে লাউডস্পিকার বসিয়ে সতর্কবার্তা প্রচার করছে পুলিশ। তাতে বলা হচ্ছে, সমাবেশের কোনো আইনি অনুমোদন নেই; সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি সাধন, স্লোগান দেওয়া বা পুলিশের ওপর আক্রমণ করা হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকার মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার এবং আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলোর মাধ্যমেও স্থানীয়দের সমাবেশ এড়িয়ে চলার বার্তা পাঠানো হয়েছে। নয়া দিল্লি ও মধ্য দিল্লির বিভিন্ন হোটেল ও লজে চিরুনি তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বাসা ভাড়া প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম ও বাড়ির মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বিক্ষোভে অংশ নিতে আসা কাউকে যেন কোনোভাবেই কক্ষ বা বাড়ি ভাড়া না দেওয়া হয়।

আন্দোলন সামলাতে গিয়ে যাতে বিতর্ক বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ না ওঠে, সেজন্য এবার নজরদারিতে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও তার ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত মাঠপর্যায়ের সদস্যদের শরীরে ‍‍`বডি ক্যামেরা‍‍` যুক্ত করা হয়েছে। পুলিশের প্রতিটি পদক্ষেপ সরাসরি নথিবদ্ধ করতে মাঠে নামানো হয়েছে শত শত পেশাদার ভিডিওগ্রাফার ও আলোকচিত্রীকে।

পুলিশের এই কৌশলের পেছনে কাজ করছে অতীত অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক নানা বিতর্ক। গত ২০ জুলাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ চলাকালে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যার ধারাবাহিকতায় পদত্যাগ করতে হয়েছিল ভারতের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। চলতি মাসের শুরুতে আরেকটি কর্মসূচিতে এক নারী বিক্ষোভকারীকে মারধর ও লাঞ্ছনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে বাহিনীটি।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করা হয়েছে। চিঠিতে আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষের প্রতি মানবিকতা ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে উল্লেখ করা হয়, পুলিশ সদস্যরাও সমাজের অংশ এবং তাদেরও ঘরে ফেরার অপেক্ষায় স্বজনেরা থাকেন; রাষ্ট্রীয় পোশাক গায়ে জড়ালেই কোনো মানুষের মানবিক পরিচয় বিলীন হয়ে যায় না।