মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬,

ব্যাটারি অটোরিকশার ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিংয়ে বিদ্যুৎ উধাও

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ০৭:২০ পিএম

ব্যাটারি অটোরিকশার ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিংয়ে বিদ্যুৎ উধাও

ছবি: সংগৃহীত

ব্যাটারি অটোরিকশায় সাধারণ প্যাডেল রিকশার তুলনায় অর্ধেক ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছানো গেলেও, এর আড়ালে রাষ্ট্রকে বছরে অন্তত চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি গুনতে হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট, ভয়াবহ বিদ্যুৎ অপচয় এবং মারাত্মক পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনতে এবার ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় এসব যানকে শৃঙ্খলায় আনার কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন নিয়মে প্রতিটি অটোরিকশায় বসানো হবে কিউআর কোডযুক্ত নম্বর প্লেট, যার ভেতরে লুকানো থাকবে বিশেষ ট্র্যাকিং চিপ।

পুলিশ শুধু এই কিউআর কোড স্ক্যান করেই মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির বৈধতা, একই নম্বরে কয়টি গাড়ি চলছে এবং চালকের লাইসেন্স আছে কিনা তা যাচাই করতে পারবে।  দেশে বর্তমানে ব্যাটারি অটোরিকশার সঠিক সংখ্যা নিয়ে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে। সরকারি হিসাবমতে দেশে এর সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ লাখ হলেও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তথ্যমতে এই সংখ্যা ৪০ লাখেরও বেশি। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই চলছে ১০ লাখের বেশি অটোরিকশা এবং প্রতিদিন নতুন করে সড়কে নামছে প্রায় ৩০০টি মিটারবিহীন যান। একটি অটো পূর্ণ চার্জ হতে পাঁচ থেকে ছয় ইউনিট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যার ফলে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ শুধু এই খাতেই খরচ হচ্ছে।

অর্থাৎ, ১০০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে তার পাঁচ ইউনিটই গিলে খাচ্ছে এই অটোরিকশা। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে বৈধ চার্জিং স্টেশন রয়েছে মাত্র তিন হাজার ৩০০টি। অন্যদিকে, শুধু ঢাকা শহরেই অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার, যা বৈধ স্টেশনের তুলনায় প্রায় ১৫ গুণ বেশি। বাসাবাড়ির সংযোগ ও স্থানীয় ট্রান্সফরমার থেকে অবৈধভাবে তার টেনে চার্জ দেওয়ার কারণে নিয়মিত ট্রান্সফরমার পুড়ে যাচ্ছে এবং আবাসিক এলাকায় লোডশেডিং বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বৈধ স্টেশনগুলো দিনে মাত্র ২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, কিন্তু অবৈধ সংযোগের হিসাব মেলালে এই খরচ দ্বিগুণেরও বেশি দাঁড়ায়। এর ফলে সরকারের বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে, যা দিয়ে অনায়াসেই দেশের দুটি বড় ফ্লাইওভার নির্মাণ করা সম্ভব।

অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এই যানটি কেড়ে নিচ্ছে বহু মানুষের প্রাণ। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ব্যাটারি অটোরিকশার ৮৭০টি দুর্ঘটনায় ৮৭৫ জন নিহত ও এক হাজার ৭৭৯ জন আহত হয়েছেন। আর ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ছয় হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে ১৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই অটোরিকশা জড়িত ছিল, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৯১১ জন। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাধারণ প্যাডেল রিকশায় দুর্ঘটনার হার ১৮ শতাংশ হলেও ব্যাটারি রিকশায় তা ৩০ শতাংশ।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির ক্ষেত্রে। এসব অটোরিকশায় ব্যবহৃত সস্তা লেড-এসিড ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার পর খোলা মাঠে ফেলে দেওয়া হয় অথবা শিশুদের দিয়ে ভাঙানো হয়। একটি রিকশা বছরে প্রায় ২০ কেজি সিসা ছড়ায়, সেই হিসাবে ৪০ লাখ রিকশা থেকে বছরে ৮০ কোটি কেজি অবিনশ্বর সিসা পরিবেশে মিশছে যা মাটি, পানি, ধান ও মাছের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার শিশুদের রক্তে স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ গুণ বেশি সিসার উপস্থিতি রয়েছে, যা শিশুদের মস্তিষ্ক ও প্রাপ্তবয়স্কদের কিডনি স্থায়ীভাবে বিকল করে দিচ্ছে।

বুয়েটের অধ্যাপক কাজী শিফুন নেওয়াজ এই পরিস্থিতিকে সাধারণ দূষণ না বলে সরাসরি ‘অ্যাডভান্সড স্টেজের ক্যানসার ঝুঁকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঢাকার কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০টি নতুন অটোরিকশা তৈরি হচ্ছে, যেগুলোর প্রতিটির দাম ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কারখানাগুলোর একটিরও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। এত ক্ষতিকর দিক থাকার পরও সাধারণ মানুষের কাছে এটি আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, ঢাকায় ৭৬ শতাংশ যাত্রাই দুই কিলোমিটারের কম, যার জন্য নির্দিষ্ট বাস সার্ভিস বা উপযুক্ত ফুটপাত নেই। 

সংবাদমাধ্যম ঢাকা ট্রিবিউনের হিসাব বলছে, পাঁচ কিলোমিটার পথ প্যাডেল রিকশায় যেতে ১০০ টাকা খরচ হলেও অটোরিকশায় লাগে মাত্র ২৫ টাকা, যা সিএনজিচালিত অটোরিকশার চেয়েও অর্ধেক। প্যাডেল চালক দিনে ৫০০ টাকা আয় করলেও ব্যাটারি চালক শারীরিক কষ্ট ছাড়াই আয় করেন ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা। বুয়েটের অধ্যাপক হাসান জানান, সারা দিন প্যাডেল টানলে শরীর ভেঙে দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের সৃষ্টি হয়, তাই প্রযুক্তির প্রয়োজন রয়েছে, তবে তা হতে হবে নিয়ন্ত্রিত। সব মিলিয়ে চালক, গ্যারেজ মালিক ও যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ীসহ প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা এই খাতের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার খন্দকার নাজমুল হাসান জানান, প্রতিদিন অভিযান চালানো হলেও লোকবলের অভাবে বিপুল সংখ্যক অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। 

ঢাকায় ৯৯২টি বৈধ গ্যারেজের বিপরীতে ৪৮ হাজার অবৈধ পয়েন্ট রয়েছে এবং প্রতিটি গ্যারেজে ৮০ থেকে ১৫০টি গাড়ি গাদাগাদি করে রাখা হয়। এই লুকোচুরি খেলা বন্ধ করতে সরকার এখন প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে। রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে ইতোমধ্যে ৫০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরা বসানো হয়েছে এবং তেজগাঁও ও রমনায় আরও ২০০টি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে, যা কিউআর কোড স্ক্যান করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা ও জরিমানা করবে।

বিশেষজ্ঞরা বর্তমান লেড-এসিড ব্যাটারির পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী, দূষণমুক্ত ও সৌরবিদ্যুৎ-বান্ধব লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন এবং সরকারও নতুন নীতিমালায় এটি অন্তর্ভুক্ত করছে। এছাড়া প্রধান সড়কের বদলে শুধু ভেতরের গলিতে চলাচলের জন্য সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে ‘জোনিং’ পদ্ধতি চালু এবং চালক ও গ্যারেজগুলোকে বৈধতা দিয়ে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এসব পরিবেশবান্ধব রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট তৈরি ও কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের গ্রিন ফান্ড সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।