অক্টোবর ২, ২০২৬, ১২:১২ পিএম
কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর ব্যবসায়ী শেখ নূর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের কানাডায় এক দশকের আর্থিক লেনদেন নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট। কানাডার বিভিন্ন ব্যাংকে এই পরিবারের বিপুল অঙ্কের লেনদেনের তথ্য মিলেছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শেখ নূর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলারের বেশি লেনদেন হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪৩ কোটি টাকা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে ওই দশ বছরে ১৭টি সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন, দুটি সন্দেহজনক লেনদেনের চেষ্টার তথ্য, ১১৮টি বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, ২৬টি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের প্রতিবেদন এবং দুটি আন্তঃদেশীয় মুদ্রা লেনদেনের তথ্য উল্লেখ রয়েছে। এসব লেনদেনে কানাডিয়ান ডলার ছাড়াও মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড, সিঙ্গাপুর ডলার ও থাই বাথ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে কর কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে কানাডায় নূর ইসলাম পরিবারের লেনদেনের অনুসন্ধানের সঙ্গে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের দাবি, সালমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনার আগেই নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল।
নূর ইসলামের আয়কর নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিনি রেমিট্যান্স হিসেবে ৯৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা দেশে আনার তথ্য দেখিয়েছেন। একই সময়ে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় প্রায় ১০৪ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত আয়কর ছিল ৬৯ লাখ টাকা। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তার সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল প্রায় ১৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তার ঘোষিত সম্পদের পরিমাণে বড় ব্যবধান দেখা যায়।
কর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নূর ইসলামের আয়কর নথিতে বিদেশি নাগরিকত্ব, কানাডায় থাকা সম্পদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের কোনো তথ্য উল্লেখ নেই। বিদেশে থাকা এসব সম্পদের তথ্য রিটার্নে গোপন করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আয়কর নথি অনুযায়ী, শেখ নূর ইসলাম বাংলাদেশে একাধিক ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তিনি প্রায় ১৪টি কোম্পানির পরিচালক পদে রয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডমিনোজ পিজা, ফুওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস, এসআই ট্রাভেলস অ্যান্ড কার্গো সার্ভিসেস, ইস্টার্ন হোটেল অ্যান্ড বার, টাভার্স সাপ্লায়ার্স, রেডিও মাসালা, পল বেকারি অ্যান্ড ক্যাফে রেস্টুরেন্ট, ডমিনাস অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি, স্পাইস টেলিভিশন, কয়লা পাব, স্টারবার ক্যাফে, ফুওয়াং ডমিনোজ প্রোপার্টিজ, স্পাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ও টিম হর্টনস।
কৃষি খাতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে বলে নথিতে বলা হয়েছে। ব্যবসার পাশাপাশি ঢাকার একটি কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের সঙ্গেও তার নাম জড়িত। ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে তার স্ত্রী শীলা ইসলাম ও মেয়ে তাসনিম ইসলামের নাম রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কানাডাতেও নূর ইসলামের ব্যবসা রয়েছে। সেখানে তিনি জুম জুম পিজার সঙ্গে যুক্ত এবং শেখ নূর ম্যানেজমেন্টসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে তার নাম পাওয়া গেছে। তার স্ত্রী শীলা ইসলাম কানাডায় ডমিনোজ পিজা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তার মেয়ে দিশা ইসলাম সান লাইফের বিনিয়োগ পরামর্শক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি সেখানকার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত। অন্য মেয়ে তাসনিম ইসলামও কানাডার নাগরিক এবং ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নূর ইসলাম, শীলা ইসলাম, দিশা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নামে কানাডার টরন্টো-ডোমিনিয়ন ব্যাংক, ব্যাংক অব মন্ট্রিয়েল ও টিডি ব্যাংকে একক ও যৌথ হিসাব থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া শীলা ইসলামের নামে একটি মর্টগেজ হিসাবের তথ্যও নথিতে এসেছে। সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, নূর ইসলামের কানাডায় থাকা নাগরিকত্ব, ব্যবসা ও সম্পদের তথ্য বাংলাদেশের কর নথিতে উল্লেখ করা হয়নি। বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের দলিলও কর নথিতে সংযুক্ত ছিল না। বাংলাদেশের কর আইন অনুযায়ী বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা থাকায় সম্পদ বা আয় গোপন করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার পর ফেসবুক লাইভে এসে সালমান হামলার জন্য একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দায়ী করেন। পরে তার ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের তথ্য তলব করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পুনরায় নিশ্চিত করেছেন, সালমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনার অনেক আগেই নিয়মিত গোয়েন্দা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শেখ নূর ইসলামের পরিবারের বিরুদ্ধে এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শুরু হয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন