মে ১৬, ২০২৬, ১০:৫৮ এএম
কোরবানির পশু জবাইয়ের আগমুহূর্তে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ার দৃশ্যটি সাধারণ মানুষের মনে নানা কৌতূহল ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। অনেকে মনে করেন পশু তার আসন্ন মৃত্যু দেখতে পেয়ে কাঁদছে, আবার কেউবা একে অলৌকিক কোনো ঘটনার ইঙ্গিত মনে করেন। তবে প্রচলিত জনশ্রুতির বাইরে আধুনিক প্রাণিবিজ্ঞান এবং ইসলামের দালিলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে এই কান্নার আসল ও বাস্তব কারণগুলো জানা যায়।
প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মানুষের মতোই অশ্রুগ্রন্থি থাকে।পশুর চোখ দিয়ে অশ্রুসদৃশ তরল পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে তীব্র মানসিক চাপ ও ভয়কে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।
কেমব্রিজ ডিক্লারেশন অন কনশাসনেস ২০১২ অনুযায়ী, প্রাণীরা মানুষের মতোই নিখুঁতভাবে ভয় ও যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে। জবাইয়ের আগে সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশ, চারপাশের মানুষের ভিড় এবং অন্য পশুর রক্তের গন্ধে পশুর শরীরে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। এই তীব্র ভীতি থেকে তৈরি হওয়া স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার কারণে পশুর চোখে অশ্রুসদৃশ তরল দেখা দেয়।
পশুর তীব্র ঘ্রাণশক্তি ও সংবেদনশীলতাও এই আতঙ্ক সৃষ্টির পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। অন্য পশুর রক্ত বা হাড়ের গন্ধ পেলে তারা সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে বিপদের সংকেত পেয়ে চরমভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি ধুলোবালি বা দীর্ঘক্ষণ খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে চোখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং অস্বস্তি কমাতে প্রাকৃতিকভাবেই চোখে জল আসে।ইসলাম ধর্ম আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগেই পশুপাখির প্রতি সদয় হওয়ার এবং তাদের অধিকার রক্ষার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত এক নির্ভরযোগ্য হাদিস অনুযায়ী, একবার রাসুলুল্লাহ (স.) এক আনসারির বাগানে প্রবেশ করে একটি উটকে অস্থির অবস্থায় অশ্রুবিসর্জন করতে দেখেন।
নবীজি উটটির কাছে গেলে সেটি শান্ত হয় এবং এরপর তিনি উটের মালিককে ডেকে পশুকে ক্ষুধার্ত রাখা ও কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করার কড়া তাগিদ দেন। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে পশুরাও কষ্ট ও অবহেলা অনুভব করে এবং তা নিজস্ব আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করে।পশু যেন জবাইয়ের আগে কোনোভাবেই আতঙ্কিত না হয় বা ভয়ের কারণে চোখে জল না আসে, সেজন্য ইসলামি শরিয়তে কয়েকটি কাজ কঠোরভাবে এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া এবং এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (স.) এক ব্যক্তিকে পশুর সামনে ছুরি ধার দিতে দেখে চরম রাগান্বিত হয়ে জানতে চেয়েছিলেন সে পশুকে দুইবার মারতে চায় কি না।
জবাইয়ের সময় পশুকে সর্বনিম্ন কষ্ট দেওয়ার জন্য ইসলামে ইহসান বা দয়ার নীতি অনুসরণের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (স.) প্রতিটি বিষয়ে সদাচার ফরজ করার কথা বলেছেন এবং জবাইয়ের সময় উত্তম পদ্ধতি অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই জবাইয়ের আগে ছুরি ভালোভাবে ধারালো করে নেওয়ার এবং পশুকে কোনো ধরনের বাড়তি কষ্ট না দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। জবাইয়ের স্থানে পশুকে নিষ্ঠুরভাবে টেনে-হিঁচড়ে নেওয়া বা প্রহার করা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী।
আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে পশু মৃত্যুর ফেরেশতাকে দেখে বা জান্নাত দেখে কাঁদে, তবে কোরআন ও সহিহ হাদিসে এর কোনো নির্ভরযোগ্য ও সরাসরি বর্ণনা পাওয়া যায় না। অদৃশ্য জগতের এই বিষয়গুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট শরিয়তি ভিত্তি না থাকায় আলেমগণ একে স্রেফ প্রচলিত ভ্রান্তি হিসেবে গণ্য করেন। মূলত তীব্র ভয়, মানসিক চাপ এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির প্রতি শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়াই পশুর চোখ দিয়ে পানি পড়ার আসল কারণ, যা আধুনিক বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন