মে ১৭, ২০২৬, ০৫:১২ পিএম
ঈদুল আজহা ঘনিয়ে এলেই পশুপ্রেমের নামে কোরবানির বিরোধিতা করার একটি পরিচিত বিতর্ক সামনে আসে। তবে শরিয়ত ও বিজ্ঞানের আলোকে কোরবানি অমানবিক নয়। গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এটি কোনো উদ্দেশ্যহীন রক্তপাত নয় বরং এটি স্রষ্টার প্রতি পরম আনুগত্য, মানবকল্যাণ এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষার একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত বিধান।
আল্লাহ তাআলা প্রাণিজগৎকে মানবসভ্যতার সুনির্দিষ্ট কল্যাণের সঙ্গেই যুক্ত করেছেন।পবিত্র কোরআনের সুরা নাহলের পাঁচ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে চতুস্পদ জন্তুগুলো মানুষের উপকারের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে মানুষের জন্য শীত নিবারক উপকরণ ও বহু উপকার রয়েছে এবং হিসেবে সেগুলো থেকে মানুষ আহার্য গ্রহণ করে।
তবে কোরবানি কোনো পাশবিক আনন্দ বা নিছক পশুহত্যার নাম নয় এবং শরিয়তের বিধানে কোরবানি অমানবিক নয়, বরং এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের আমিত্ব ও লালসাকে বিসর্জন দিয়ে স্রষ্টার প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করা। সুরা হজের সাইত্রিশ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর গোশত এবং রক্ত পৌঁছায় না, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় মানুষের তাকওয়া।
পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রেও ইসলামে দয়া, পরিচ্ছন্নতা ও পশুর কষ্ট কমানোর বিষয়ে সহিহ মুসলিমের হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়েছে যেন সবাই উত্তম উপায়ে জবাই সম্পন্ন করে এ জন্য ছুরি অত্যন্ত ধারালো রাখা, এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই না করা এবং পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়ার ওপর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।পশু জবাইয়ের এই দৃশ্যকে বিরোধীরা প্রায়ই নিষ্ঠুর বললেও আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে কোরবানি অমানবিক নয় এবং এতে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
জার্মানির হানোভার বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুচিকিৎসা বিভাগের গবেষক অধ্যাপক উইলহেম শুলৎজে ও তাঁর সহকর্মী ড. হাজিম পরিচালিত একটি বিশেষ গবেষণায় পশুর মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড স্থাপন করে হালাল জবাই ও আধুনিক স্টানিং পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক তুলনা করা হয়। সেখানে দেখা গেছে, ধারালো ছুরিতে দ্রুত জবাইয়ের প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘাড়ের প্রধান রক্তনালি একসঙ্গে কেটে যাওয়ায় পশু দ্রুত সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে এবং সম্পূর্ণ রক্ত নিষ্কাশিত হওয়ায় মাংস ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ও স্বাস্থ্যকর হয়, যেখানে স্টানিং পদ্ধতিতে তীব্র যন্ত্রণার তরঙ্গ রেকর্ড করা হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ কোটি পশু-পাখি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে জবাই করা হয় এবং সেই তুলনায় সারা বিশ্বে কোরবানির মোট সংখ্যা এই বার্ষিক বাণিজ্যিক জবাইয়ের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। যারা কোরবানিকে নিষ্ঠুর বলেন, তাদের একটি বড় অংশই সারাবছর নির্দ্বিধায় মুরগি, হাঁস বা মাছ খেয়ে থাকেন এবং রেস্তোরাঁয় চিকেন ফ্রাই খাওয়ার সময় তাদের মনে কোনো পশুপ্রেম জাগ্রত হয় না।
অথচ বিশ্বের বৃহৎ মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানাগুলোতে পশুর কল্যাণের ন্যূনতম মান নিশ্চিত না করেই প্রতিনিয়ত কোটি কোটি প্রাণী জবাই হচ্ছে, যা নিয়ে কোনো উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ দেখা যায় না। পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রাণিজ প্রোটিন মানবদেহের অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং দেশের অনেক দরিদ্র মানুষের জন্য কোরবানির গোশতই বছরের প্রধান পুষ্টির উৎস হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি এর চামড়া, হাড় ও রক্তসহ অন্যান্য উপজাত বিভিন্ন শিল্প ও জৈবসার উৎপাদনে সরাসরি ব্যবহৃত হয়।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন