রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬,

ঠাকুরগাঁও জেলার প্রধান দর্শনীয় স্থান ও যাতায়াত গাইড

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

জুন ২২, ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম

ঠাকুরগাঁও জেলার প্রধান দর্শনীয় স্থান ও যাতায়াত গাইড

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত অনিন্দ্য সুন্দর একটি জেলার নাম ঠাকুরগাঁও, যা প্রাচীনকালে বহু জমিদার ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা ঠাকুরের বসবাসের স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। এক সময় এটি দিনাজপুর জেলার একটি মহাকুমা থাকলেও পরবর্তীকালে ১৯৮৪ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। প্রায় ১ হাজার ৮০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই জেলাটিতে বর্তমানে প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষ বসবাস করেন এবং এর প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সৌন্দর্য পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে।

রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক বা রেলপথে সরাসরি ঠাকুরগাঁও জেলায় যাতায়াত করার চমৎকার সুব্যবস্থা রয়েছে।ঢাকা থেকে এসি ও নন-এসি বাসে ঠাকুরগাঁও যাতায়াত করতে যথাক্রমে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা ভাড়া লাগে। আবার কেউ যদি ট্রেনে ভ্রমণ করতে চান তবে শোভন চেয়ারের জন্য ৫২০ টাকা এবং এসি আসনের জন্য ১ হাজার ৳২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয় করতে হবে। 

জেলা শহরে পৌঁছেই পর্যটকরা প্রথমে শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মনোরম ডিসি পার্কে ঘুরে আসতে পারেন। এই পার্কটি বিভিন্ন বয়সী মানুষের জন্য চমৎকার একটি বিনোদন কেন্দ্র, যেখানে বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ, শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় রাইড এবং বসার জন্য সুন্দর বেঞ্চ রয়েছে।শহর থেকে রিকশা বা স্থানীয় পরিবহনে চড়ে দর্শনার্থীরা বালিয়া গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক বালিয়া মসজিদ বা জীন মসজিদ পরিদর্শনে যেতে পারেন। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে যে কোনো এক অমাবস্যার রাতে একটি দল উড়ে যাওয়ার সময় এই মসজিদটি নির্মাণ শুরু করে এবং ভোর হওয়ার আগে একটি গম্বুজ অসম্পূর্ণ রেখে চলে যায়। 

তবে ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী বালিয়া জমিদার বাড়ির রাজকন্যা গুলমতি চৌধুরীর স্বামী মেহের বক্স চৌধুরী এই করছিদটির নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন এবং ১৩১৭ বঙ্গাব্দে তার মৃত্যুর পর এর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। চুন-সুরকি ও হাতে পোড়ানো লাল ইট দিয়ে নির্মিত এই পিলারহীন মসজিদে ৩টি গম্বুজ ও ৮টি মিনার রয়েছে এবং এর দেয়ালে পদ্ম ও কলসের চমৎকার কারুকাজ দৃশ্যমান। এটি পূর্ব-পশ্চিমে ৬২ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং উত্তর-দক্ষিণে ৬৯ ফুট ২ ইঞ্চি দীর্ঘ একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা।

বালিয়া মসজিদ থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে ভুল্লি নদীর ওপরে নির্মিত ভুল্লিবাদ পর্যটকদের কাছে মিনি কক্সবাজার নামে সুপরিচিত। বিকেল বেলা এখানে অসংখ্য মানুষ নদীর পানির স্রোতধারা দেখতে এবং গোসল করতে ভিড় জমান। এরপর দর্শনার্থীরা সরাসরি চলে যেতে পারেন বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার হরিণমারি সীমান্তবর্তী মুন্ডমালা গ্রামে অবস্থিত দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সূর্যপুরী আমগাছটি দেখতে। প্রায় ২৩০ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী আমগাছটি প্রায় আড়াই বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত এবং এর বর্তমান মালিক নূর ইসলাম ও সাইদুল ইসলাম।

এই বিশাল সূর্যপুরী আমগাছটি দেখার জন্য দর্শনার্থীদের জনপ্রতি ২০ টাকা মূল্যের প্রবেশ টিকিট কাটতে হয়। এখান থেকে কিছুটা সামনে এগোলে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি বালিয়াডাঙ্গি উপজেলায় একটি দৃষ্টিনন্দন চা বাগান চোখে পড়ে, যা পর্যটকদের সিলেটের চা বাগানের মতো অনুভূতি দেয়। চা বাগানের রূপ উপভোগ শেষে মাত্র ৪০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে রানীশংকৈল উপজেলার জগদল গ্রামে অবস্থিত জগদল রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়িতে যাওয়া যায়। রাজার পুত্র বীরেন্দ্র কুমার কর্তৃক নির্মিত ভারতের সীমান্তবর্তী এই রাজবাড়িটি বর্তমানে অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে কঙ্কালপ্রায় ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় অবস্থিত হরিপুর রাজবাড়িটি আরেকটি প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন, যার সংস্কার কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। কাপড়ের ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ঘনশ্যাম কুন্ডুর বংশধর রাঘবেন্দ্র রায় চৌধুরী ১৮৯৩ সালে এই জমিদার বাড়ির গোড়াপত্য করেন এবং তার পুত্র যোগেন্দ্রনারায়ণ রায় এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। যোগেন্দ্রনারায়ণ রায়ের সুশাসনের কারণে ব্রিটিশ সরকার তাকে রাজস্বী উপাধিতে ভূষিত করেছিল। এর পাশেই রানীশংকৈল উপজেলার কুলিক নদীর তীরে প্রায় ১০ একর জায়গার ওপর রাজা টঙ্কনাথের রাজবাড়ি অবস্থিত। উনবিংশ শতকে বুদ্ধিনাথ চৌধুরী এর নির্মাণ শুরু করলেও কাজ শেষ করেন রাজা টঙ্কনাথ চৌধুরী, যাকে দিনাজপুরের রাজা গিরিজনাথ রায় রাজা উপাধি দিয়েছিলেন।

পীরগঞ্জ উপজেলায় বিনোদনের জন্য গড়ে উঠেছে ফান সিটি চিলড্রেন পার্ক, যেখানে প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ৫০ টাকা এবং বাইক পার্কিং ভাড়া ২০ টাকা। এই পার্কে মুক্তমঞ্চ, সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের ছবি এবং ছোট-বড় সবার জন্য ৬ থেকে ৭টি চমৎকার রাইডের ব্যবস্থা রয়েছে। শীতকালে ঠাকুরগাঁও ভ্রমণের অন্যতম সেরা আকর্ষণ হলো জেলা শহর থেকে মাত্র ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নারগুন খেজুর বাগান। শীতের সকালে কুয়াশাচ্ছন্ন এই বাগানে সারি সারি খেজুর গাছের সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি টাটকা খেজুরের মিষ্টি রস পানের সুযোগ মেলে।

ভ্রমণের শেষভাগে দর্শনার্থীরা ১৭৬৭ সালে হালিমুদ্দিন, রওশন আলী ও জামালউদ্দিনের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত জামালপুর জমিদারবাড়ি শাহী মসজিদ দেখতে পারেন। পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের এই ব্যয়বহুল মসজিদের নির্মাণ কাজের জন্য মূল জমিদার বাড়ির কাজ দোতলার পর অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল এবং এর ভেতর ৪৪টি কক্ষ রয়েছে। সবশেষে পর্যটকরা জেলা শহরের কাছেই অবস্থিত বলাকা উদ্যানে গিয়ে বিশাল পুকুর ও নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটাতে পারেন। মাত্র ২০ টাকা অটো ভাড়ায় যাতায়াতযোগ্য এই উদ্যানটি প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটানোর জন্য একটি আদর্শ স্থান।