এপ্রিল ১১, ২০২৬, ১১:০১ এএম
সারাদেশে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্য খাতে নতুন দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি মৃত্যুর খবর আসছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত ৯ এপ্রিল সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১৭৭ জন শিশু এবং ল্যাব পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৬৮ জনের শরীরে।
ক্রমবর্ধমান এই সংক্রমণ রুখতে সরকার ইতোমধ্যে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও প্রাদুর্ভাব কবে কমবে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ১৪৪ জন শিশু। এর মধ্যে সরাসরি হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে ২৩ জনের। বর্তমানে মোট আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪০৯ জনে।
এ ছাড়া সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে আশার কথা হলো আক্রান্তদের মধ্যে ৬ হাজার ৬০৯ শিশু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন টিকা কার্যক্রম সফল হলে আগামী এক মাসের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব কমতে শুরু করতে পারে।
আগামী ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনসহ ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে এবং ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে একযোগে বড় পরিসরে টিকাদান শুরু হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে আগে টিকা নেওয়া থাকলেও ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এই বিশেষ ক্যাম্পেইনে হামের টিকা দেওয়া যাবে। তবে যেসব শিশুর তীব্র জ্বর রয়েছে বা হাসপাতালে অন্য অসুস্থতা নিয়ে ভর্তি আছে তাদের সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত এই টিকা দেওয়া যাবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে মানবশরীরে টিকার কার্যকারিতা বা প্রতিক্রিয়া শুরু হতে সাধারণত ১৫ দিন থেকে এক মাস সময় লাগে। শিশু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মীর্জা মো. জিয়াউল ইসলাম এ বিষয়ে জানান টিকা দেওয়ার পর শরীরে ইমিউন সেল তৈরি হয় এবং মেমোরি সেল হিসেবে তা জমা থাকে। এই সেলগুলো দ্বিতীয় ডোজের সময় থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করে। ফলে একবার টিকা কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হলে এক মাসের মধ্যেই এর ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। তবে চলমান ক্যাম্পেইনে টিকা নেওয়া শিশুদের আগামী জুন মাসে পুনরায় বুস্টার ডোজ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে টিকার প্রভাবে এক মাসের মধ্যে রোগীর সংখ্যা কমে আসবে তবে মৃতের সংখ্যা কমতে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে একটি টিকা দেওয়া হলেও পুরোপুরি প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের জন্য দুটি টিকা প্রয়োজন। জুন মাসে যখন বড় পরিসরে গণটিকা শুরু হবে তখন দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে সংক্রমণের হার দ্রুত শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। মূলত টিকার দুটি ডোজ সম্পন্ন হলেই একটি শিশু হামের হাত থেকে শতভাগ সুরক্ষা পায়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের অধিকাংশেরই সংক্রমণ ছড়িয়েছে আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে এসে। বিশেষ করে একই পরিবারের একাধিক শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। হাম অত্যন্ত দ্রুত ছড়ানো একটি সংক্রামক ব্যাধি হওয়ায় ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী ঢাকা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। এই ঝুঁকি এড়াতে পাড়া-মহল্লা ভিত্তিক আইসোলেশন বা আক্রান্তদের আলাদা রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দিলেই শিশুকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি অন্যদের থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই বিশাল টিকাদান কর্মসূচি সফল করার ওপরই এখন নির্ভর করছে দেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন