মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬,
আত্মশুদ্ধি ও আমল

চোখের জিনা থেকে বাঁচার উপায়

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম

চোখের জিনা থেকে বাঁচার উপায়

চোখ মহান স্রষ্টার এক অনন্য নিয়ামত, যা দিয়ে মানুষ জগতের রূপ ও সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করে এবং সত্যের নিদর্শন অবলোকন করে। তবে এই দৃষ্টিশক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানব অন্তর ও চরিত্রের পবিত্রতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতার কারণে অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত অশালীন দৃশ্যের মুখোমুখি হওয়া অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো অসাবধানতাবশত হঠাৎ কোনো আপত্তিকর দৃশ্য চোখে পড়ে, আবার কখনো মানুষ জেনেশুনে নিষিদ্ধ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। প্রথম ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি পড়ার সাথে সাথে তা ফিরিয়ে নেওয়া আবশ্যক, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে হারাম দৃশ্যে মগ্ন হওয়া ইসলামে সুস্পষ্ট গুনাহ হিসেবে চিহ্নিত।

পবিত্র কুরআনে দৃষ্টি সংযত রাখার বিষয়ে পুরুষ ও নারী উভয়কেই সমানভাবে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা আন-নুরের ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন, মুমিন পুরুষদের বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র এবং তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত। এর ঠিক পরবর্তী আয়াতে একইভাবে মুমিন নারীদেরও নিজেদের দৃষ্টি অবনত রাখা ও লজ্জাস্থানের সুরক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে আত্মশুদ্ধি ও চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা কোনো একক লিঙ্গের নয় বরং সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোখের অপব্যবহারের ভয়াবহতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমের ২৬৫৭ এবং সহিহ বুখারির ৬২৪৩ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, চোখের ব্যভিচার বা জিনা হলো নিষিদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করা। হঠাৎ কোনো দৃশ্য নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। হাদিসে এসেছে, হজরত জারির ইবন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে যাওয়া সম্পর্কে রাসুলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার সরাসরি আদেশ দেন (সহিহ মুসলিম ২১৫৯)।

সুরা আল-ইসরা-এর ৩৬ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে মানুষের কান, চোখ ও অন্তরের প্রতিটি অনুভূতির বিষয়ে বিচার দিবসে জবাবদিহি করতে হবে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে এবং চোখের জিনা থেকে মুক্ত থাকতে পাঁচটি বাস্তবমুখী আমল ও অনুভূতি জাগ্রত রাখা জরুরি।

প্রথমত, আল্লাহ সবকিছু দেখছেন—এই সার্বক্ষণিক অনুভূতি অন্তরে দৃঢ় রাখা। লোকচক্ষুর আড়ালে বা নির্জন কক্ষে মানুষ যা-ই করুক না কেন, আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে কিছুই নেই। সুরা আল-আলাকের ১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ কি জানে না যে আল্লাহ সবকিছু প্রত্যক্ষ করছেন।

দ্বিতীয়ত, অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো নিষিদ্ধ বা অশোভন দৃশ্য সামনে আসামাত্র কোনো ধরনের ইতস্তত না করে তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া এবং দ্বিতীয়বার সেদিকে না তাকানো।

তৃতীয়ত, প্ররোচনামূলক ডিজিটাল পরিবেশ পরিহার করা। সামাজিক মাধ্যমে যেসব পেজ, চ্যানেল বা অ্যাকাউন্ট অশ্লীল কনটেন্ট ছড়ায়, সেগুলোকে অবিলম্বে আনফলো, ব্লক কিংবা কনটেন্ট ফিল্টারের আওতায় এনে নিজের ব্রাউজিং পরিবেশকে নিরাপদ রাখা।

চতুর্থত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, নিয়মিত জিকির এবং কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অন্তরকে সর্বক্ষণ ইতিবাচক ব্যস্ততায় আবৃত রাখা। সুরা আল-আনকাবুতের ৪৫ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। কোনো কারণে পদস্খলন ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে তওবা করা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, দৃষ্টিশক্তিকে মহান আল্লাহর দেওয়া একটি পবিত্র আমানত মনে করা। এই চোখ দিয়ে কল্যাণকর জ্ঞান অর্জন, গঠনমূলক পাঠ এবং সৃষ্টির মহিমা অবলোকন করে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিশুদ্ধ রাখাই একজন মুমিনের স্থায়ী আত্মিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।