জুলাই ৭, ২০২৬, ০৩:২১ পিএম
করতোয়া নদীর তীরে আজও যেন ভেসে আসে বহু শতাব্দী আগের ইতিহাসের সুর। কোনো এক সময় ঘোড়ার খুরের শব্দে মুখর থাকা দিনাজপুরের এই জনপদ আজও বহন করে চলেছে সমৃদ্ধ অতীত ও গৌরবের স্মৃতি। একসময়ের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ঘোড়াঘাট বর্তমানে কৃষি ও অর্থনীতির এক নতুন সম্ভাবনার নাম।
ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, প্রাচীনকালে প্রাগজ্যোতিষপুর বা কামরূপ রাজ্যের অংশ ছিল এই অঞ্চল। সুলতানি ও মোগল আমলে এটি ‘সরকার-এ-ঘোড়াঘাট’ নামে পরিচিতি পায় এবং উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। সেসময় ঘোড়াঘাট ছিল এক ব্যস্ত নদীবন্দর। পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে আনা যুদ্ধের ঘোড়াগুলো করতোয়া নদীপথে এখানে নামানো হতো, যার নাম থেকেই অঞ্চলটির নামকরণ হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। মীর জুমলার মতো বিখ্যাত মোগল ফৌজদাররা এখান থেকেই প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
আজকের ঘোড়াঘাট কেবল ইতিহাসের স্মৃতিধন্য স্থানই নয়, এটি কৃষি বিপ্লবেরও কেন্দ্র। প্রাচীন বন্দরের সেই জৌলুস হারিয়ে গেলেও আজ এখানে উৎপাদিত আলু, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন ও বিভিন্ন মৌসুমি সবজি দেশের খাদ্য সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখছে। এখানকার বিখ্যাত লিচু ও আমের সুনাম এখন দেশজুড়ে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দিনাজপুর, হিলি স্থলবন্দর ও রংপুর-বগুড়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এই জনপদ এখন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ট্রানজিট পয়েন্ট।
ঐতিহাসিক নিদর্শনের দিক থেকেও ঘোড়াঘাট বেশ সমৃদ্ধ। হযরত শাহ ইসমাইল গাজী (রহ.)-এর মাজার, প্রাচীন দুর্গ ও সুরা মসজিদের মতো স্থাপনাগুলো আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও প্রচারণার অভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পূর্ণ বিকশিত না হলেও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় এটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে ইতিহাস ও আধুনিকতার মিশেলে ঘোড়াঘাট উত্তরবঙ্গের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। প্রাচীন সভ্যতার স্পন্দন আর বর্তমানের কৃষি সাফল্যের সমন্বয়ে ঘোড়াঘাট নতুন সময়ের পথে এগিয়ে চলেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন