অক্টোবর ৩, ২০২৬, ১১:০৮ পিএম
টানা মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায় তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে বলে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শনিবার রাজধানীর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত জাতীয় আন্তবিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতিবিষয়ক প্রতিযোগিতা ইকোনথন ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, লাগামহীন পণ্যমূল্যের পাশাপাশি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম কর আদায়, ব্যাংকিং খাতে গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো বহুমুখী জটিল চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে বর্তমান অর্থনীতি অতিবাহিত হচ্ছে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তাই এখন একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন অত্যন্ত ধীরগতির, গত দশকের তুলনায় আন্তর্জাতিক অর্থায়নের খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদ ও শুল্কবাধা ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি ও পরিবহন খাতের ব্যয়কে চরম অস্থির করে রেখেছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবও প্রতি বছর জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন আর্থিক ক্ষতির বোঝা যোগ করছে। বাংলাদেশের মতো আমদানির ওপর নির্ভরশীল ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ওপর এই ধরনের বাহ্যিক আঘাত সরাসরি আছড়ে পড়ে। এই অভিঘাত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পণ্যের দাম, স্থানীয় মুদ্রা টাকার বিনিময় হার এবং উৎপাদনমুখী কারখানাগুলোর বৈশ্বিক রপ্তানি আদেশের ওপর সরাসরি দৃশ্যমান হচ্ছে।
নীতিনির্ধারণের চরম বাস্তবতার কথা তুলে ধরে আমীর খসরু বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিটি দিনই এক একটি অভাবনীয় চমকের দিন। একটি নির্দিষ্ট অনুমানের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা হলেও পরবর্তীতে হঠাৎ জ্বালানি তেলের দামের ধাক্কা, বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র চাপ, বন্যা কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এসে সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। এমন প্রতিকূল পরিবেশে অসম্পূর্ণ তথ্য ও অত্যন্ত সীমিত সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছে দায়বদ্ধতা বজায় রেখেই সরকারকে জরুরি আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সামগ্রিক অর্থনীতি এখন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকট দূর করার পাশাপাশি মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে রাজস্ব বা কর আদায় অত্যন্ত অপ্রতুল। একই সাথে আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন অপরিহার্য। সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা। সমস্যা লুকিয়ে রেখে কোনো লাভ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাস্তব সংকটকে অকপটে স্বীকার করলেই সমাধানের কার্যকর পথ তৈরি হয়।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, নির্দিষ্ট সময়সূচি যা-ই নির্ধারণ করা হোক না কেন, বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধার বদলে নিজস্ব সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার শক্তিতে টিকে থাকার জন্য দেশের অর্থনীতিকে পূর্ণ প্রস্তুত করতে হবে। সরকারের অগ্রাধিকারের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা, মূল্যস্থিতি নিশ্চিত করা, করব্যবস্থাকে সহজ, ন্যায্য ও প্রযুক্তিনির্ভর করা এবং শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রতিটি রাষ্ট্রীয় পয়সার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতে প্রশাসন অবিচল থাকবে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রতিকূল চাপের মুখে冷静ভাবে চিন্তা করা, পরিস্থিতির সাথে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া এবং বস্তুনিষ্ঠ যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে পারাই কার্যকর নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে বড় দক্ষতা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন